অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে আলোচনা-সমালোচনা দেশ জুড়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেসিডেন্টের বিদায়
অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্টে মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বর্তমান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করা সদ্যবিদায়ি প্রেসিডেন্টে আগামীকাল রোববার সপরিবারে বঙ্গভবন ছাড়বেন। প্রেসিডেন্টের পরিবারের এক সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সদ্যবিদায়ি প্রেসিডেন্টে মো. সাহাবুদ্দিন শিগগির বঙ্গভবন ছেড়ে দেবেন। সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। বঙ্গভবন ছেড়ে মো. সাহাবুদ্দিন পরিবারসহ রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসায় উঠবেন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
এদিকে প্রেসিডেন্টে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেরিতে হলেও জাতির ওপর থেকে স্বৈরাচারের কালো ছায়া সরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গত শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এ এস এম বাহাউদ্দিন প্রেসিডেন্টের সই করা পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদে স্পিকারের দপ্তরে পৌঁছে দেন। পরে বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পদত্যাগপত্র গ্রহণের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি গ্রহণ করেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার বলেন,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের দফা (৩) অনুযায়ী মহামান্য প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র গতকাল ২৪ জুলাই বিকেল ৫টা ১ মিনিটে আমার কাছে দাখিল করেছেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। পদত্যাগপত্রটি আমি গ্রহণ করেছি এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই ঘটনা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। যদিও শপথ অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। এরপরই শুরু হয় আরও বড় বিতর্ক।
সাক্ষাৎকার ঘিরে বিতর্ক: গত ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিনিয়র সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট বলেন, তার কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই এবং তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি। এই বক্তব্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কারণ, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকারে সেই বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় তখন। সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করেন। নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠে, তাঁকে সরানো সম্ভব কিনা। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে সে সময় অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলেন,রাজনৈতিক দাবি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্টকে সরানো সহজ নয়। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
নতুন সংসদেও রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্ক: চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রেসিডেন্টের সংসদে ভাষণ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। সংসদে প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার সময় বিরোধী দল প্রেসিডেন্টর অতীত ভূমিকা, বিশেষ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করে। এক পর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও প্রেসিডেন্টমো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক শেষ হয়নি, বরং নতুন সংসদেও তা ফিরে আসে। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রেসিডেন্ট তাদের সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই থেকেছেন এবং খুব কমই সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা কিছু ঘটনা, সামাজিক মাধ্যমে পুরোনো কার্যকলাপ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা এবং পরে দেওয়া সাক্ষাৎকার সব মিলিয়ে তিনি এমন এক প্রেসিডেন্ট পরিণত হন, যাঁকে ঘিরে বিতর্ক কখনও পুরোপুরি থামেনি। ৭৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যদিও প্রেসিডেন্টের পদটি সাংবিধানিকভাবে মূলত আনুষ্ঠানিক, গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য দেয়া হয়নি। সূত্র: ইনকিলাব
