নেতাদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিব্রত জামায়াত     

জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা দলটিকে নতুন করে অস্বস্তিতে ফেলেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে ঘটনার প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ভেতরে শৃঙ্খলাভঙ্গ, বিদ্রোহী প্রার্থী, সাংবাদিকের ওপর হামলা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক ঘটনায় দীর্ঘদিনের ‘সুশৃঙ্খল দল’ হিসেবে জামায়াতের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সোমবার (২০ জুলাই) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি তাদের নজরে এসেছে।গাজী নজরুল ইসলাম তাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই এ বিয়ে হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে প্রকাশ্যে এলো, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এরপর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। দলীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, গত ১৭ বছর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একইসঙ্গে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান বিতরণকে ঘিরে একটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকায় তার মেয়ের নাম রয়েছে- এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। পরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তার ব্যক্তিগত সহকারীকে বরখাস্ত করা হয়। ঘটনাটি দলীয়ভাবে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্থানীয় জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিলের পর তর্ক-বিতর্ক থেকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে জামায়াত। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে তদন্তসাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

তার আগে গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার খুতবার আগে এক আলোচনায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে টুকুকে তিনি ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পরে বক্তব্যটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

এ ঘটনায় গত ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির কর্নেল একটি মানহানির মামলা দায়ের করেন। একই অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা করেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ভিপি শামীম খান।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এ অভিযোগে দণ্ডবিধির ২৯৬, ৫০০ ও ৫০৪ ধারায় মামলা দুটি দায়ের করা হয়।

নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির না হওয়ায় গত ২১ এপ্রিল আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশেরও নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ১৪ জুন শুনানি শেষে আদালত দুটি মামলাতেই তার স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করেন।

বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন গত ৭ জুন সংসদের বাইরে থাকা মাল্টিমিডিয়ার রিপোর্টারদের সঙ্গে আমির হামজা বাজেট নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। আরেকবার বলেন, বাজেট ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। আমির হামজা পরে জানান, তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন। আমির হামজার বক্তব্যেও অস্বস্তিতে পড়েছিলেন জামায়াত নেতৃত্ব।

বাজেট অধিবেশনে গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনও ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এই বক্তব্যের কারণে প্রথমে সামাজিক মাধ্যম, পরে সরকারি দলের সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। বিএনপির জোট শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ টিপ্পনী কেটে বলেন, তিনি জামায়াত এমপিকে ওভেন দিতে চান। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে ওয়াশিং মেশিন দেওয়া হলে সংসার সাজিয়ে দেওয়া হবে। গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই; চারজনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন; ১১ জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা।’

পরে জানা যায়, এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। তার বাবা জীবিত। এ বক্তব্যের কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। সামাজিক মাধ্যমে ট্রল হয়। এমপি পরে ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে সুনামগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে এরপরও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় দলীয় সমর্থন পাওয়ার জন্য তদবির ও প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দলীয় শৃঙ্খলা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন।

গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ‘লোহাগাড়ার এমপি আরমান সাহেব, শাহজাহান চৌধুরী এখানে আসলে পায়ে গুলি করব’— এমন একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে লক্ষ্য করে এই হামলার পরিকল্পনার অডিও ফাঁস হওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল।

ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে সংসদ সদস্যের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে পরিচিত আরমান উদ্দিনের কণ্ঠ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়েছিল। এতে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ওপর সহিংস হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত থাকায় এলাকা জুড়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সূত্র: কালের কন্ঠ

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট