যে কারণে মধ্যবিত্ত এখন সবচেয়ে বেশি বিপদে

নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেনিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে নীরব সংকটের নাম এখন মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্তের হাতে সম্পদ ও আয়ের সুযোগ বাড়লেও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিছুটা হলেও রয়েছে। কিন্তু মাঝখানে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠী— চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, বেসরকারি কর্মচারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষ— ক্রমেই চাপে পড়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে তাদের আয় দিয়ে আর জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা খরচ, বাড়িভাড়া, শিক্ষাব্যয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, পরিবহন ব্যয় ও করের চাপ— সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে চলছে, কেউ ঋণ নিচ্ছে, আবার কেউ জীবনযাত্রার মান কমাতে বাধ্য হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি মধ্যবিত্তের ওপর: গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, সবজি— প্রায় সব পণ্যের দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যবিত্তের বড় সংকট হলো— তারা দরিদ্র নয়, তাই সরকারি সহায়তা পায় না; আবার ধনীও নয়, তাই বাড়তি ব্যয় বহনের সক্ষমতাও নেই। ফলে মূল্যস্ফীতির পুরো চাপ তাদের কাঁধেই এসে পড়ে। একসময় যে পরিবার মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় স্বচ্ছন্দে চলতে পারত, এখন একই পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।   বাড়িভাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট ও সার্ভিস চার্জও বেড়েছে। শহুরে জীবনে শুধু বাসা ভাড়াই এখন অনেক পরিবারের মোট আয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়িভাড়ার চাপও ক্রমেই বাড়ছে। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় এখন মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক: একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে পারতো। এখন সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক বছরে ব্যাপক বেড়েছে। ডায়াগনস্টিক টেস্ট, ওষুধ, হাসপাতাল বিল– সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় একটি বড় রোগ পুরো পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এখনও কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ নিচ্ছে কিংবা জমি-গয়না বিক্রি করছে। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যয় বাড়লেও সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা এখনও বড় সংকট হয়ে রয়েছে। সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তিকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নেমে যাচ্ছে। ‘বাংলাদেশে অপূরণীয় স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয়ের বিষয়ে পুনর্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ নিজে বহন করলেও ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশে। গবেষণাটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ এবং ৬২ হাজারের বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে।গবেষণায় আরও দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫ শতাংশ মানুষের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পূরণ হয়নি। উচ্চ ব্যয়, সচেতনতার অভাব, রোগভীতি ও সহায়তাকারীর সংকট এর প্রধান কারণ। গ্রামে চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের হার ৬৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এ হার ৫৯ শতাংশ।বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে রাজশাহীতে চিকিৎসা না পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রামে এ হার তুলনামূলক কম, প্রায় ৫১ শতাংশ। জেলাভিত্তিক চিত্রে নড়াইলে অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদার হার সর্বোচ্চ ৮১ শতাংশ, আর সবচেয়ে কম ফেনীতে, ১৮ শতাংশ।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। ক্যানসার চিকিৎসায় গড়ে ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা, হৃদরোগে প্রায় ১ লাখ টাকা এবং কিডনি রোগে প্রায় ৬৩ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। শিক্ষাব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ: মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় স্বপ্ন থাকে সন্তানদের ভালো শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন, কোচিং, বই, পরিবহন ও ডিজিটাল ডিভাইসের খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাব্যয়ও বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমনকি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আনুষঙ্গিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।ফলে বহু পরিবার এখন সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটাতে অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে।বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষা খাতের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশই পরিবারগুলোকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যা বিশ্বে অন্যতম উচ্চ হার।শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যয় ২৫ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, বই, পরিবহন, ডিজিটাল ডিভাইস ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় অভিভাবকদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকলেও অধিকাংশ পরিবারের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে অনেক পরিবারকে সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হচ্ছে। আয় বাড়ছে না, চাকরির অনিশ্চয়তা বাড়ছে: বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক মানুষের অভিযোগ– মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন বাড়ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে বছর শেষে বেতন বৃদ্ধি সীমিত, আবার কোথাও চাকরি হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যাংক, আইটি, মিডিয়া, বিপণন, ছোট শিল্প ও সেবা খাতের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন বলে মনে করছেন শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে নতুন কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।অন্যদিকে তরুণ শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ চাকরি পাচ্ছে না।   কিন্তু বাস্তব আয় না বাড়ায় এই জীবনযাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা ও হতাশাও বাড়ছে। করের চাপ নিয়েও উদ্বেগ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের প্রভাবও মধ্যবিত্তের ওপর বেড়েছে। মোবাইল, ইন্টারনেট, ভোগ্যপণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংকিং সেবা– বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্কের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর কাঠামোতে ভারসাম্য না থাকলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়বে। কারণ উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় মধ্যবিত্তের আয়ের বড় অংশই ভোগ ব্যয়ে চলে যায়। কেন সবচেয়ে বেশি বিপদে মধ্যবিত্ত? অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মধ্যবিত্ত এখন ‘চাপের মাঝখানে আটকে পড়া শ্রেণি’। কারণতাদের আয় সীমিত, সরকারি সহায়তা সীমিত, সামাজিক ব্যয় কমানো কঠিন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি, সঞ্চয় দ্রুত কমে যাচ্ছে, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। সামনে কী হতে পারে: বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং মধ্যবিত্তবান্ধব করনীতি গ্রহণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাদের মতে, মধ্যবিত্তই একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে ভোগব্যয় কমে যায়, সঞ্চয় কমে যায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এখন ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে আয় আর ব্যয়ের ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক চাপের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট