আধা কেজি মাছেও ৩০ টাকা মাশুল নগরীর বিষ্ণুপুর ফেরিঘাটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার

রাজশাহী নগরীর বড়কুঠি এলাকার বিষ্ণুপুর ফেরিঘাটে নির্ধারিত মাশুলের বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পদ্মার ওপারের চর খানপুর ও চর মাজারদিয়ার দরিদ্র মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণ মাছের জন্যও অতিরিক্ত মাশুল আদায় করা হচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। চর এলাকার মানুষ বলছেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় কয়েকঘণ্টা পরিশ্রম করে আধা কেজি থেকে এক-দুই কেজি মাছ পেলেও ঘাটে নামার সময় ব্যাগ বা থলে প্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এতে সারাদিনের আয়ের অর্ধেক যাচ্ছে মাশুল দিতেই।

এ নিয়ে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভুক্তভোগী শ্রমজীবী জেলেরা বড়কুঠি ঘাটে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিলে ইজারাদারের লোকজন তাদের বাধা দেন এবং সাংবাদিকদের সামনেই হুমকি-ধমকি দেন বলে অভিযোগ করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে উপস্থিত সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। মানববন্ধনে চর খানপুর গ্রামের জেলে আলিফ, আমিরুল, মোজাহার, বাক্কার, সামালসহ প্রায় ৫০ জন জেলে অংশ নেয়ার জন্য সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইজারাদার পেশি শক্তি ব্যবহার করে তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেন। জেলেদের অভিযোগ, ঘাটে মাশুল আদায়ের জন্য নিয়োজিত ইজারাদারের লোকজন সরকারি নির্ধারিত হার অনুসরণ না করে নিজেদের মতো করে টাকা আদায় করছেন। নদী থেকে আহরণ করা মাছের পরিমাণ খুবই সামান্য হলেও ব্যাগ বা থলে ধরে মাশুল নেওয়া হচ্ছে।

জেলেরা বলেন, আধা কেজি মাছ নিয়েও ঘাটে নামলে ব্যাগ বা থলে প্রতি ৩০ টাকা দিতে হয়। কারও হাতে দুই ধরনের ছোট মাছের দুটি ব্যাগ থাকলে ৬০ টাকা দিতে হয়। নদীতে আগের মতো মাছ নেই। কয়েক ঘণ্টা নদীতে থাকার পর আধা কেজি বা এক কেজি মাছ পাওয়া যায়। সেই মাছ বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয়। অপর জেলে বলেন, রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরি। দু-এক কেজি মাছ বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে। সেই সামান্য টাকা থেকে যদি ব্যাগ বা থলে প্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা দিতে হয়, তাহলে আমাদের জন্য সেটা খুবই কষ্টের।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, নদী থেকে মাছ ধরে শহরে বিক্রির ক্ষেত্রে ঘাটের নির্ধারিত মাশুলের তালিকায় কোনো আলাদা হার উল্লেখ নেই। এরপরও মাছের ব্যাগ বা থলে ধরে টাকা আদায় করা হচ্ছে। শুধু মাছ নয়, ঘাট দিয়ে বিভিন্ন পণ্য ও কৃষিপণ্য পারাপারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় মানুষের পারাপারের মাশুল ৩ টাকা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। গবাদিপশুর ক্ষেত্রে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা, এক বস্তার ক্ষেত্রে ৫ টাকার পরিবর্তে ৩০ টাকা, মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ৭ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা এবং ছাগলের ক্ষেত্রে ১১ টাকার পরিবর্তে ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এক বান্ডিল টিনের জন্য ২৫ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা, স্যালো মেশিনের জন্য ৫০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা, ৪০ লিটার ডিজেলের জন্য ৫ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা এবং সার বস্তাপ্রতি ৫ টাকার পরিবর্তে ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে ইজারাদার মোসাদ্দাত হোসেন (তুহিন) গত ৯ সেপ্টেম্বর নামমাত্র সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘাটের মাশুল বৃদ্ধির দাবি জানান। তার দাবি ছিল, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী যাত্রীর টোল ২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা, মালামালসহ যাত্রী পারাপার মণপ্রতি ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা, গরু-মহিষ ৪০০ টাকা, ছাগল-ভেড়া ৬০ টাকা, আরোহীসহ রিকশা ও মোটরসাইকেল ৩০ টাকা এবং মাছের ঝোলা ৩০ টাকা করার প্রস্তাবসহ অন্যান্য হার নির্ধারণ। তিনি সংবাদ সম্মেলন করেই নিজে নিজেই মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর মনগড়াভাবে বাড়ানো মাশুল তুলছেন ইজারাদার তুহিনের লোকজন। চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঘাটে দৃশ্যমানভাবে যে মাশুলের তালিকা টাঙানো হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবে আদায় করা টাকার কোনো মিল নেই।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ৬ নম্বর হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রমিজ আলম বলেন, ঘাটটি চরাঞ্চলের মানুষের শহরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ। সাধারণ মানুষ ও জেলেদের কাছ থেকে নির্ধারিত মাশুলের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জনগণের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাউকে হুমকি বা অপমান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, মানুষের কাছ থেকে তালিকায় নির্ধারিত টাকার জায়গায় বেশি টাকা নেয়ার বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার। ইজারাদারেরও যদি কোনো দাবি বা ব্যাখ্যা থাকে, সেটি তারা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা আদায় কিংবা ভয়ভীতি দেখানো উচিত নয়।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালে মো. নুর-ঈ সাইদ বলেন, খেয়াঘাট ইজারার বিষয়টি মূলত সিটি করপোরেশনের প্রশাসন শাখা থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ইজারাসংক্রান্ত বিষয়গুলো তারাই মনিটরিং করে থাকে। তবে নির্ধারিত তালিকার বাইরে অতিরিক্ত টোল আদায় বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ইজারাদার মোসাদ্দাত হোসেন (তুহিন) নিজেকে এক কাউন্সিলরের ভাতিজা পরিচয় ও ব্যস্ততা দেখিয়ে বলেন, সিটি করপোরেশন তালিকা তৈরি করছে। যার কারণে আমি বেশি মাশুল আদায় করছি। আমি ব্যস্ত আছি বলে ফোন কেটে দেন।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট