৭৮ বছর আগে জিন্নাহর ঢাকা সফরে যা ঘটেছিল     

ব্রিটিশশাসিত ভারত ভাগ হওয়ার সাত মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পূর্ব পাকিস্তানে এটি ছিল তার প্রথম এবং শেষ সফর। যক্ষ্মাসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা মি. জিন্নাহ এই সফরের ছয় মাসের মাথায় মারা যান।

দশ দিনের সফরকালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং কয়েকটি জায়গায় ভাষণও দেন। এর মধ্যে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন মি. জিন্নাহ। মূলত তিনি ঢাকা আসার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বাংলা, যা তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা ছিল, সেটাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বিক্ষোভ, ধর্মঘটসহ নানান কর্মসূচি পালন করে আসছিল। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকা, যশোর, সিলেটসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগে সেটি শান্ত করার উদ্দেশ্যে তখন ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি তখন ছাত্রনেতা ছিলেন, তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছেন যে মি. জিন্নাহর ঢাকা আগমনকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের মধ্যে একটা প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল যে, রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তিনি দলের ওপরে উঠবেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মি. জিন্নাহ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেবেন। কিন্তু উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণায় বাঙালিরা আশাহত হন। যার ফলে তাদের মধ্যে মি. জিন্নাহর জনপ্রিয়তা অনেকাংশে কমে আসে বলে তখনকার বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও বইপত্রের লেখা থেকে জানা যায়। এরপর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, যাকে ‘কায়েদে আজম’ বা মহান নেতা ডাকা হতো, তার সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের কথা-কাটাকাটি হয়, এমনকি জিন্নাহকে অপসারণের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। আর কী কী ঘটেছিল ওই দশ দিনে? সে সময়ের বিভিন্ন স্মৃতিকথা, বইপত্র এবং পত্রপত্রিকার খবর থেকে সেটাই এই প্রতিবেদনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

গভর্নর জেনারেল মি. জিন্নাহর সফরকে কেন্দ্র করে তখন বড় আকারে প্রস্তুতি নিয়েছিল তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার। তার আগমন উপলক্ষে আলাদা একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির অধীনে ছোট ছোট আরো অন্তত নয়টি উপকমিটি গঠিত হয়, যারা মূলত মি. জিন্নাহকে স্বাগত জানানোর জন্য ঢাকায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটানো, তোরণ নির্মাণ, আলোকসজ্জা, বিভিন্ন উৎসব এবং জনসভার আয়োজনসহ সফরের যাবতীয় বিষয়ে প্রস্তুতি নেন। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘ঢাকায় জিন্না’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, গভর্নর জেনারেল ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই শহরজুড়ে নির্মাণ করা হয় অর্ধশতাধিক তোরণ। সেগুলোসহ ঢাকার প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে মি. জিন্নাহর বড় বড় ছবি এবং পাকিস্তানের পতাকা টানানো হয়। তোরণগুলোতে আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। ‘কায়েদে আজমের সম্মানে শহর সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে এবং প্রায় সর্বত্র আলোকসজ্জা করা হয়েছে’, নিজের ডায়েরিতে লেখেন তখনকার তরুণ ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ।

জনসভার জন্য ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত, সেখানে বড় মঞ্চ তৈরি করা হয়। সফলভাবে সমাবেশ সম্পন্ন করার জন্য আট শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের একটি দল ছাড়াও অ্যাম্বুলেন্স ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ঢাকার বাইরে থেকে যারা জিন্নাহকে স্বাগত জানাতে আসবেন, তাদের আসা-যাওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেন ও স্টিমারের ব্যবস্থা করে প্রশাসন। সেই সঙ্গে, তাদের খাওয়াদাওয়ার সুবিধার্থে আলাদা দোকান বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বিমানে চড়ে করাচি থেকে সরাসরি ঢাকায় আসেন তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে ছিলেন তার বোন ফাতেমা জিন্নাহ। বিমানটি ঢাকার তেজগাঁও এলাকার পুরনো বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর মি. জিন্নাহকে স্বাগত জানান পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বোর্ন, গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ আরো অনেকে। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ও পাকিস্তান নারী ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা মি. জিন্নাহকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এদিকে সেদিন দুপুরের পর ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল। সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল বলে দৈনিক আজাদ পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। মি. জিন্নাহকে বিমান থেকে নামতে দেখার পর তারা তাকে স্বাগত জানিয়ে নানান ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন। বিমানবন্দর থেকে মি. জিন্নাহকে নেওয়া হয় রমনা এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি বাসভবনে, যেখানে থাকতেন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ। সেখানে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বিমানবন্দর থেকে রমনা এলাকার বাড়িতে যাওয়ার সময় রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ মি. জিন্নাহকে শুভেচ্ছা জানান। তবে ভাষা আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকায় তাদের মধ্যে কাউকে সেভাবে স্লোগান ধরতে দেখা যায়নি বলে নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন তখনকার ছাত্রনেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ‘একটা বিষয় লক্ষণীয় যে লোকজনের মধ্যে স্লোগান তোলার মতো তেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। সাম্প্রতিক পুলিশি নির্যাতনের ফলে ছাত্ররা নিস্পৃহ’, লিখেছেন মি. আহমদ।

ঢাকায় আসার পরদিন সেনানিবাসে একটি কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২০ মার্চ সকালের কুর্মিটোলা প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি ইংরেজিতে একটি ভাষণও দিয়েছিলেন। সেখানে পূর্ববঙ্গকে তিনি পাকিস্তানের অন্যতম ‘শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ‘বহু শতাব্দী পর্যন্ত আপনারা যে সুযোগ পাননি, আজ সেই সুবর্ণ সুযোগ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বাংলাকে, বিশেষত পূর্ববঙ্গকে সামরিক লক্ষ্যের দিক থেকে অহবেলার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল’, ভাষণে বলেন মি. জিন্নাহ।পূর্বাংশের বাসিন্দাদেরকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতে বাংলার মুসলমানরা যে বীরত্ব দেখিয়েছেন তা ইতিহাসে সুবিদিত…এখন বাংলার পুরনো সামরিক উদ্দীপনা পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বের কাছে বাংলার শক্তি প্রদর্শনের সবরকম সুবিধা আমরা পেয়েছি। দেশরক্ষা ও দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাদের।’ ভাষণ শেষে মি. জিন্নাহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর এম আহমদকে ‘মিলিটারি ক্রস’ পদক পরিয়ে দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে বিক্ষোভ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ নানান কর্মসূচি পালন করে আসছিল। ফলে সেনানিবাসের অনুষ্ঠান শেষ করেই একইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেন মি. জিন্নাহ। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল রমনায় তিনি যেখানে উঠেছিলেন, সেই চিফ সেক্রেটারির সরকারি বাসভবনে। লেখক, গবেষক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের প্রয়াত নেতা বদরুদ্দীন উমর তার ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, আমন্ত্রণ পেয়ে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলেন যেসব ছাত্রনেতারা বৈঠকে গিয়েছিলেন, সেখানে জগন্নাথ হলের দুজন হিন্দু ছাত্রনেতাও ছিলেন। ছাত্রপ্রতিনিধিদের প্রত্যেকের সাথে পরিচিত হওয়ার পর মি. জিন্নাহ তাদের কাছে জানতে চান যে, তিনি ছাত্রদের জন্যে কী করতে পারেন। জবাবে ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে মহম্মদ তোয়াহা বলেন যে, ইচ্ছে করলে মি. জিন্নাহ একটি ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিতে পারেন। জিন্নাহ বলেন, এ বিষয়ে তিনি চিন্তা করে দেখবেন। লেখক ও গবেষক মি. উমর তার বইতে লিখেছেন, পনেরো-বিশ মিনিটকাল স্থায়ী এই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোন আলোচনা কোন পক্ষ থেকেই উত্থাপন করা হয়নি। জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের কুশল জিজ্ঞাসা করেন এবং অত্যন্ত মামুলী কিছু কথাবার্তার পর তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। “এই সময় মহম্মদ তোয়াহা তাঁর হাতে ইংরেজিতে লিখিত একটি স্মারকলিপি দিয়ে বলেন, ‘ভাষা সমস্যার উপর এটি একটি স্মারকলিপি। আপনি এটি পড়ে দেখবেন।’ জিন্নাহ্ স্মারকলিপিটি হাতে নিয়ে পাশের টেবিলে রেখে দেন, কিন্তু সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করেন না”, ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন মি. উমর। তিনি আরো লিখেছেন যে, ঘর ছেড়ে সকলে কিছুটা বাইরে আসার পর মি. জিন্নাহর মিলিটারি সেক্রেটারি হঠাৎ দৌড়ে এসে মহম্মদ তোয়াহাকে বলেন যে, তিনি ও নজরুল ইসলাম যেন গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে আরেকবার দেখা করেন। ‘মিলিটারি সেক্রেটারির এই কথা শুনে তাঁরা দু’জনে ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতে জিন্নাহ্ তাঁদের বললেন যে, সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে একটা ভুল হয়ে গেছে। তিনি শুধু মুসলমান ছাত্রদের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন, হিন্দু ছাত্রদের সাথে নয়’, নিজের বইতে লিখেছেন মি. উমর। সূত্র: কালের কন্ঠ

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট