দিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ও দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে কী বলছেন বিশ্লেষকেরা
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার ভারতের নয়াদিল্লিতে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তাঁকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়ায় ভারত সরকারের কাছে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টার সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক আসামি। দেশে তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে প্রথমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। পরে তিনি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন।
দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দিয়ে আসছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ই–মেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। এই প্রথম দিল্লির কোনো অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সরাসরি বক্তব্য দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন। দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়ার দুই বছর পর তিনি এমন ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে নিজের গুরুত্ব বজায় রাখা, সমর্থকদের ধরে রাখা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে আবার সক্রিয় করার মরিয়া চেষ্টা হিসেবে এমনটা বলছেন। গত বৃহস্পতিবার জাপানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পেছনে তিনটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছেন মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি মার্কিন চিন্তক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক। তাঁর তুলে ধরা কারণগুলো হচ্ছে-
প্রথমত, তাঁর (শেখ হাসিনার) ধারণা হতে পারে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীন বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় তাঁর জন্য বেশি অনুকূল। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। যে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়, সেই রায়ও ওই সরকারের আমলেই হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা আদালতে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাই তিনি আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে নিজের নাম কলঙ্কমুক্ত করতে চাইতে পারেন।
কুগেলম্যানের মতে, সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি হলো তিনি (হাসিনা) রাজনীতি ছেড়ে শুধু বাংলাদেশে ফিরে অবসর জীবন কাটাতে এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করতে চান।নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান। ওই নেতার মতে, দলের প্রতি নেতা-কর্মীদের আনুগত্যের প্রতিদান দেওয়ার একটি উপায় হলো তাঁর দেশে ফিরে আসা।
আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বর্তমানে শেখ হাসিনার কড়া সমালোচক মাহমুদুর রহমান মান্না তাঁর (হাসিনা) দেশে ফেরার ঘোষণাকে নিজের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর সেটিকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করার জন্য শেখ হাসিনা তাঁদের কিছুটা সুযোগ দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি।’ মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, ‘তিনি (হাসিনা) দলের স্বার্থে দেশে ফিরবেন, এমন ধারণা অমূলক।’ ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদারের মতে, দেশে ফেরার হুমকি দিয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে চান। সূত্র: প্রথম আলো
