তিন দশক ধরে অচল নগরীর ট্রাফিক সিগন্যাল
স্টাফ রিপোর্টার
প্রায় তিন দশক ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে রাজশাহী নগরীর আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশই এখন অকার্যকর। ফলে ব্যস্ত সময়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার বদলে এখনো ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের, অন্যদিকে যানজট ও জনভোগান্তিও বাড়ছে।
নগরীর সাহেববাজার, কাদিরগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মোড়ে দিনের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন সদস্যকে একদিকে যানবাহন থামাতে, অন্যদিকে চলাচলের সংকেত দিতে হচ্ছে। পুলিশের হাতের সংকেতেই কখনো থামছে গাড়ির সারি, আবার সংকেত পরিবর্তন করতেই শুরু হচ্ছে যান চলাচল। ফলে যানবাহনের চাপ বাড়লে কোনো কোনো মোড়ে দ্রুত যানজট তৈরি হচ্ছে।
নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, মোড়গুলোতে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি থাকলেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। যানবাহনের চাপ অনুযায়ী ট্রাফিক সদস্যরা কখনো একদিকে গাড়ি থামিয়ে অন্যদিকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছেন। ব্যস্ত সময়ে একই মোড়ে একাধিক দিক থেকে যানবাহন আসায় পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। ‘যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অচল সিগন্যাল পুনরায় চালু, প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন সিগন্যাল স্থাপন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। স্কুল-কলেজ, কোচিং সেন্টার ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চাপ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় শিক্ষার্থী বহনকারী যানবাহন ও অভিভাবকদের রাস্তার পাশে অবস্থানের কারণে কোথাও কোথাও যান চলাচল আরও ধীর হয়ে পড়ে। এতে স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১৯৯৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ২১টি পয়েন্টে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের দুই বছরের মধ্যেই অধিকাংশ সিগন্যাল অকেজো হয়ে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলো আর কার্যকরভাবে সচল করা হয়নি। ১৯৯৬ সালে প্রথম ধাপে সিঅ্যান্ডবি মোড়, লক্ষ্মীপুর, বিন্দু, সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, মনি চত্বর ও তালাইমারী মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। এ ধাপে ব্যয় হয় প্রায় ৩৬ লাখ টাকা।
‘নগরীতে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হলে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক সদস্যদের হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এতে পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি ব্যস্ত সময়ে যানজটও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।’
পরবর্তীতে ২০০২ সালে দ্বিতীয় ধাপে মেডিকেল কলেজ গেট, বহরমপুর বাইপাস, কোর্ট স্টেশন, কাশিয়াডাঙ্গা বাইপাসসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়। এ ধাপে ব্যয় হয় ৪৯ লাখ টাকা। শেষ ধাপে উৎসব সিনেমা হল মোড়, সাগরপাড়া, শিরোইল স্টেশন, জিয়া শিশু পার্ক, নওদাপাড়ার আমচত্বরসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। তিন ধাপে নগরীর মোট ২১টি মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের এক যুগ না পেরোতেই অধিকাংশ ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের মধ্যেই সিংহভাগ সিগন্যাল অকেজো হয়ে যায়।
পথচারী রেদোয়ান বলেন, আগে কাদিরগঞ্জ থেকে সাহেববাজার যেতে কয়েক মিনিট সময় লাগত। এখন যানজটের কারণে একই পথ পাড়ি দিতে অনেক বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে কোচিং সেন্টার ছুটির সময় অভিভাবকদের রাস্তার দুই পাশে অবস্থানের কারণে যানজট আরও তীব্র হয়। কখনো কখনো সেই যানজট স্বাভাবিক হতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
‘আগে কাদিরগঞ্জ থেকে সাহেববাজার যেতে কয়েক মিনিট সময় লাগত। এখন যানজটের কারণে একই পথ পাড়ি দিতে অনেক বেশি সময় লাগে। বিশেষ করে কোচিং সেন্টার ছুটির সময় অভিভাবকদের রাস্তার দুই পাশে অবস্থানের কারণে যানজট আরও তীব্র হয়। কখনো কখনো সেই যানজট স্বাভাবিক হতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে।’ পথযাত্রী দিলরুবা আক্তার বলেন, এক মিনিট পর পর যানবাহন থামানো ও ছাড়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চলাচলে বিড়ম্বনা হয়। পথচারীদের রাস্তা পারাপারেও ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে সড়ক পার হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
নগরীর রেলগেট এলাকার অটোরিকশাচালক বাদল মোল্যা বলেন, সড়কে যানবাহনের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাস্তার ব্যবস্থাপনা ও সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিক হয়নি। ফলে যানজটের মধ্যে গাড়ি চালাতে সময় বেশি লাগে এবং যাত্রীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরীর জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সেই তুলনায় আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে নির্দিষ্ট সময় ও যানবাহনের চাপ অনুযায়ী চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ওপর চাপও কমত। অচল সিগন্যালের পাশাপাশি নগরীর যানজটের আরেকটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল। নগরবাসীর অভিযোগ, লাইসেন্স ও নম্বরপ্লেটবিহীন অনেক অটোরিকশা নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত চলাচল করছে। ফলে বৈধ ও অবৈধ যানবাহন শনাক্তকরণ এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগন্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা, পথচারী পারাপার এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, নগরীতে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু হলে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক সদস্যদের হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এতে পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি ব্যস্ত সময়ে যানজটও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অচল সিগন্যাল পুনরায় চালু, প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন সিগন্যাল স্থাপন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
