একটি রেজিষ্ট্রেশনের কাগজ দিয়ে চলে ৬ থেকে ১১টি নগরীর অটোরিকশা ভাড়া বাড়ানোর নেপথ্যে আ.লীগ নেতারা!      

হাবিব আহমেদ

এক সময় রাজশাহী মহানগরীতে স্বাচ্ছন্দে চলার বাহন ছিল অটোরিকশা। সেই অটোরিকশাই এখন গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অটোরিকশার জন্য সৌন্দর্য হারাচ্ছে পরিচ্ছন্ন নগরী রাজশাহী, বাড়ছে যানজট। চালকদের নেই নিয়মশৃংখলা, মানছেন না ট্রাফিক আইন, যেখানে সেখানে করা হচ্ছে পার্কিং, তোলা হয় যাত্রী। সব মিলে রাজশাহীবাসীর ভোগান্তির আর এক নাম অটোরিকশা। তবে বেশ কয়েকবার অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণে আনতে রাসিক পদক্ষেপ নিলেও তা সম্ভব হয়নি। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে অটোরিকশা চালকরা। যদিও চালকরা দিনভর অটোরিকশা চালিয়ে খুব বেশি লাভবান না হলেও এক শ্রেণির মানুষ আঙ্গুল ফুলে হচ্ছেন কলা গাছ। এই অটোরিকশা নগরজীবনে জীবিকার বাহন হলেও এটি এখন বাণিজ্যিক আয়ের উৎস হিসাবে পরিচিতি লাভ করছে।

নগরীতে আর ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বেশি অটোরিকশা চলাচল করলেও মাত্র ১৪ হাজার অটোরিকশায় রাজস্ব পাচ্ছে রাসিক। মজার বিষয়, একটি অটোর রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে ফটোকপি দিয়ে চালানো হচ্ছে ৬ থেকে ১১টি অটোরিকশা। এতে মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে রাসিক।

রাসিকের সূত্র অনুযায়ী, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা (বড়) রয়েছে ৮হাজার ৯শ’ ৭০টি। আর ছোট অটোরিকশা রয়েছে ৫ হাজার ৮শ’ ১৯টি। রাসিকের রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত ছোট বড় মিলে মোট অটোরিকশার সংখ্যা ১৪ হাজার ৭শ’ ৮৯টি। সংখ্যায় ১৪ হাজার ৭শ’ ৮৯টি অটোরিকশা রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। মূলত সকাল থেকে দুপুর ও দুপুর থেকে রাত সাড়ে ৪ হাজার করে অটোরিকশা নগরীতে চলার কথা। কিন্তু রাসিক ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন ২৬ হাজার থেকে ২৮ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। এই বিপুল পরিমাণ অটোরিকশার মধ্যে কিছু আসে বাইরে থেকে বাকিটা নগরীর। বাইরে থেকে আসা অটোরিকশার পরিমাণ প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজারের মধ্যে। আর বাকি ২১ হাজার থেকে ২২ হাজার অটোরিকশার মালিক নগরীর।

জানা গেছে, ২০১০ সালের দিকে প্রথম অটোরিকশা নগরীতে চলাচল শুরু করে। এরআগে ২০০৮ সালের দিকে হাতে গোনা কিছু ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা রাজশাহী নগরীতে আমদানি করা হয়। এরই মধ্যে উঠিয়ে দেয়া হয় আগের ছোট রিকশা। ২০১৫ সালের পর থেকে এক শ্রেণির মানুষ এই অটোরিকশাকে বাণিজ্যিক হিসাবে বেছে নেন। একেজন ১০ থেকে ১৫টি করে অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় খাটানো শুরু করেন। অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় খাটানো খুব লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় অটোরিকশার সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র কিনে রাখলে প্রতিমাসে আয় হবে সর্বোচ্চ ১৭ থেকে ১৮শ’ টাকা। আর ২ লাখ টাকা দিয়ে একটি অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় খাটানো হলে মাসে আয় হবে ১৫ হাজার টাকা (দিন ৫শ’)। একসাথে ৫টি অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় খাটানো হলে মাসে আয় আসবে ৭৫ হাজার টাকা। আর এই ৫টি অটোরিকশা কিনতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা। ১০ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র কিনে রাখলে মাসে আয় হবে ৯ হাজার টাকা। এতে দেখা যায়, ৫টি অটোরিকশা ১০ লাখ টাকায় কিনে ভাড়ায় খাটানো হলে মাসে আয় আসছে ৭৫ হাজার টাকা আর ব্যাংকে রাখলে মুনাফা আসবে ৯ হাজার। আবার আর ২০ লাখ টাকায় ১০টি অটোরিকশা কিনে ভাড়ায় খাটানো হলে আয় হবে মাসে দেড় লাখ টাকা। এই সূত্রটি কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অটোরিকশাকে বাণিজ্যিকরণ করে ফেলেছে। দিন শেষে চালকদের জমার টাকা দিয়ে বাজারের টাকা না থাকলেও মালিকদের পোয়াবার।

রাসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে চলাচল করা ১৪ হাজার ৭শ’ ৮৯টি অটোরিকশার চালক বা মালিককে রেজিষ্ট্রেশনের সাথে একটি করে ডিজিটাল কার্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুএকটি অটোচালক ছাড়া বাকিগুলোর কাছে রেজিষ্ট্রেশন ও ডিজিটাল কার্ডের মূল কপি নেই। সবাই চলছে ফটোকপির উপর। যে কয়জন অটোরিকশা চালকের কাছে মূল কপি পাওয়া যায় সেগুলো মূলত তাদের নিজস্ব। এ সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ। এছাড়া নগরীতে চলাচল করা প্রায় ৯০ শতাংশ অটোরিকশা চালকরা ফটোকপির উপর নির্ভরশীল। ট্রাফিক বিভাগ কখনো অটোরিকশা চালকদের আটক করলে তারা পুলিশকে জানায় মূল কপি মালিকের কাছে। নগরীতে চলাচল করা প্রায় ২১ হাজার থেকে ২২ হাজার অটোচালকেরই ফটোকপি সম্বল। অথচ রাসিক ছোট বড় মিলে সাড়ে ১৪ হাজার অটোরিকশা চালককে রেজিষ্ট্রেশন ও কার্ড দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাসিকের দেয়া রেজিষ্ট্রশনের ফটোকপি সব চালকরা পেলেন কিভাবে?

নগরীর অটোরিকশা চালক বাবলু। বর্ণালীর মোড়ে তার কাছে কাগজ দেখতে চাইলে তিনি একটি ফটোকপি বের করে দেন। তিনি বলেন মূল কপি মালিকের কাছে। তার দেয়া তথ্যেই পাশের অটোচালক বাবুর কাছে তার অটোর কাগজ দেখতে চাইলে তিনিও ফটো কপি বের করে দেন। বাবলুর ফটোকপিতে যা উল্লেখ রয়েছে বাবুর ফটোকপিতেও একই রয়েছে। কারণ একটি রেজিষ্ট্রেশনের দুটি ফটোকপি। বাবু ও বাবলু বলেন, শুধু আমাদের কাছেই নয়, এমন ফটোকপি আরো ৯ জনের কাছে রয়েছে। অটোরিকশার মালিক মাত্র একটি অটো রাসিক থেকে রেজিষ্ট্রেশন করে ১১টি অটোরিকশা কিনে সবাইকে ফটোকপি দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছেন। মালিকের নাম জানতে চাইলে তারা নাম প্রকাশ করতে অপারগতা করেন। নগরীর রেলগেটে দাঁড়ানো অটো চালক আরিফ। তার কাছে গাড়ির কাগজ দেখতে চাইলে তিনি প্রথমে না করলেও পরে রেজিষ্ট্রেশনের ফটোকপি দেখান। তার গাড়িতে নম্বরপ্লেটও রয়েছে। তিনি ওই অটো ভাড়া চালান। কাগজের সূত্র ধরে তাকে নম্বর প্লেটের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ বলেন, তার মালিকের ৬টি অটোরিকশা রয়েছে। দুটির রেজিষ্ট্রেশন ও নম্বর প্লেট রয়েছে। এই দুটি রেজিষ্ট্রেশন ও নম্বর প্লেট দিয়ে তিনি ৬টি গাড়ি চালাচ্ছেন। আরিফ জানান, পুলিশ ধরলে এই ফটোকপি দিলেই হয়। তারা তো জানতে চায় না একই ফটোকপিতে কতটা গাড়ি চলে। অটোচালক আরিফের দেয়া তথ্যে জানা যায়, এই ফটোকপি  মোটা অংকের টাকায় বিক্রিও হয়। আবার ডিজিটাল কার্ডের ফটোকপিও টাকার বিনিময়ে হাত বদল হয়। একটি সিন্ডিকেট অটোরিকশার রেজিষ্ট্রেশন ও স্মার্টকার্ড নিয়ে এমন রমরমা ব্যবসা করে। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন এলাকার অটোরিকশার গ্যারেজ ঘুরে ব্যাপক তথ্যও পাওয়া যায়।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের পর অটোরিকশা বেড়েছে মুলত আওয়ামী লীগের নেতাদের কারণে। তারাই মুলত অটোরিকশাকে বাণিজ্যিকরণ করেছেন। বিগত দিনের মত এখনও আওয়ামী লীগ নেতারাই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় এসব নেতারা একটি অটোরিকশার রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে তিন থেকে ৫টি পর্যন্ত অটোরিকশা শহরে নামিয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ বিষয়টি দেখভাল শুরুর পর নেতার ফোনে বাধ্য হয়ে ওই পথ থেকে সরে এসেছে পুলিশ। এছাড়াও বর্তমান নগরীতে চলাচল করা ৯০ শতাংশ অটোরিকশার মধ্যে ৬০ শতাংশ অটোরিকশার মালিক আওয়ামী লীগের নেতারা। বাকি ২০ শতাংশ সাধারণ চালকদের।

জানা গেছে, সম্প্রতি নগরীর অটোচালকরা মরিয়া হয়েই নিজেরাই বিভিন্ন রুটে ভাড়া বাড়িয়েছে। আর এই ভাড়া বাড়ানোর নেপথ্যে রয়েছে আওয়ামীলীগের নেতারা। চালকদের উস্কে দিয়ে রাসিকের সাথে কোনো ধরনের কথা না বলে নিজেদের মত ভাড়া বাড়িয়েছে চালকরা। আর পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছে আওয়ামী লীগের নেতারা। এসব নেতারাই অটোরিকশাকে বাণিজ্যিকভাবে রুপ দিয়েছে। এমন কি রাসিককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তারা গোপনে বেশ কয়েকবার চালকদের সাথে বৈঠক করেছে। এরপর তারাই পূর্বের ভাড়ায় ক্রস চিহ্ন মেরে ভাড়ার তালিকা তৈরি করেছে। যদিও রাসিক অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর পক্ষে না গিয়ে উল্টো অভিযান শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে রাজশাহী মহানগর ব্যাটারি চালিত চার্জার অটো শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আফাজ আলী জানান, আমরা অটোরিকশার ভাড়া বাড়াইনি। ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কথা বার্তা চলছে। তিনি বলেন, নগরীতে কাকতালিয়াভাবেই দুটো অটোরিকশা শ্রমিক দল রয়েছে। হেলাল নামে একজন রয়েছে যুগ্ম আহ্বায়ক। তবে এই হেলাল কে আমরা জানি না, চিনিও না। এই হেলাল অটোরিকশার মালিকদের সাথে যোগসাজ করে ভাড়া বাড়িয়েছে। এর প্রেক্ষিতে আমরা প্রতিবাদও করেছি।

রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাঈদ জানান, নগরীতে চলাচল করা অটোরিকশার প্রতি আমরা নজর রাখছি। তারা যেনো বেশি ভাড়া নিতে না পারে সেজন্য অভিযানও চালানো হচ্ছে। কথাবার্তা- আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কতটুকু ভাড়া বাড়ানো যায় সেটি আমরা চিন্তা করছি। তিনি বলেন, অবৈধভাবে চলাচল করা অটোরিকশার মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিবো। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট