সড়কের পাশের ওয়ার্কশপে সাধারণ বাসকে পরিবর্তন করে তৈরি হচ্ছে স্লিপার বাস  স্লিপার বাসে যাত্রীদের মৃত্যুঝুঁকি

অনুমোদিত নকশা, প্রকৌশলগত পরামর্শ ছাড়াই সড়কের পাশের গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপে সাধারণ বাসকে পরিবর্তন করে তৈরি করা হচ্ছে সিøপার বাস। অনুমোদনহীন ঝুঁকিপূর্ণ এসব বাস ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দূরপাল্লার যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য এসব বাস তৈরি করা হলেও দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে মরণফাঁদে। বিলাসবহুলের লোভ দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন রুটে নামানো হচ্ছে সিøপার বাস। কিন্তু এ পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের আতঙ্ক। দূরপাল্লার যাত্রায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্লান্তি কমাতে স্লিপার বাস তৈরি করা হয়। নির্দিষ্ট নকশা, পর্যাপ্ত চলাচলের জায়গা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত চালক-স্টাফ থাকলে এ ধরনের পরিবহনব্যবস্থা যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও পর্যটনকেন্দ্রিক রুটে যাত্রীরা স্লিপার বাসকে বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ গ্যারেজ-ওয়ার্কশপে বাস পরিবর্তন করে তৈরি করা হচ্ছে সিøপার কোচ। কোথাও পুরোনো বাসের কাঠামোতে অতিরিক্ত বার্থ বসানো হচ্ছে, কোথাও যাত্রী ধারণক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বিন্যাস পরিবর্তন করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো বাসে বডি, সিট, সিঁড়ি, জানালা ও অন্যান্য অংশে পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে ঝুঁকি নিয়েই বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে স্লিপার বাস -বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৭ আগস্ট সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন আরো ১২ জন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাশিকাপন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। কাশিকাপন এলাকার মহাসড়কে সিলেট থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউনিক পরিবহনের সঙ্গে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।

এদিকে, অবৈধ গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ পরিচালনা, অনুমোদনহীন বাসের কাঠামো পরিবর্তন, অননুমোদিত স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি এবং এ ধরনের মোটরযান সড়কে চলাচলের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বিআরটিএ। অনুমোদনহীন স্লিপার বাস তৈরি ও মেরামত এবং বিআরটিএ-এর নিবন্ধন না থাকার অপরাধে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন বডি বিল্ডিং গ্যারেজে যৌথ অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত বুধবার বিআরটিএ-এর আদালত-৫ পরিচালিত এ অভিযানে হাফিজুল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ, জিসান/নুসরাত অটোমোবাইল, আবদুল্লাহ বডি বিল্ডার্স, এ আর মটরস এবং তাব্বাসুম মটরস প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল করবে না বলে অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসের নকশা পরিবর্তন সাধারণ মেকানিক্যাল কাজ নয়। গাড়ির ওজন, ভারসাম্য, ব্রেকিং সক্ষমতা, সাসপেনশন, টায়ারের ধারণক্ষমতা, জরুরি বহির্গমন, অগ্নিনিরাপত্তা, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও দুর্ঘটনার সময় যাত্রী উদ্ধারের বিষয় বিবেচনা করে পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু প্রকৌশলী বা গণপরিবহন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা ছাড়াই কেবল ব্যবসায়িক লাভের জন্য পরিবর্তন করা হলে তা যাত্রীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দূরপাল্লার বাসের দুর্ঘটনায় স্লিপার কোচের বিস্তার নতুন ধরনের ঝুঁকি সামনে এনেছে। বাসের বডি নির্মাণ, আসন স্থাপন বা অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার কাজকে অনেক সময় সাধারণ কারিগরি কাজ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গণপরিবহনের ক্ষেত্রে সামান্য একটি পরিবর্তনও নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। স্লিপার বাসের টিকিটের দাম সাধারণ বাসের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি। যাত্রীরা অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক ভ্রমণের আশা করেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার রাতভর যাত্রার ক্লান্তি এড়াতে স্লিপার কোচ বেছে নেন। কিন্তু যাত্রী জানেন না এ বাস কতটা নিরাপদ। বিশেষ করে গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপে অনুমোদনহীন কাঠামোগত পরিবর্তন বন্ধ করতে হবে। কোনো সাধারণ মিস্ত্রি বা শ্রমিকের দক্ষতা থাকলেও গণপরিবহনের একটি বাসের নকশাগত পরিবর্তনের চূড়ান্ত দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দেয়া নিরাপদ নয়। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট