রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
নতুন প্রভাত ডেক্স:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ঘিরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের দেয়া বক্তব্য এবং অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান দুই মিত্র শক্তি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রকাশ্য এই কাদা-ছোড়াছুড়ি বা আঁতাতের অভিযোগ দেশের রাজনীতিকে বেশ জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। আর এর সুযোগ নিতে পারে পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি অর্থাৎ আওয়ামী লীগ।
সম্প্রতি রাজশাহীতে একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, ‘সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছেÑ পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল আঁতাত করেছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’ অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সরাসরি জামায়াতের নাম না নিলেও অভিযোগ করেছেন যে, আওয়ামী লীগের অপপ্রচারের সাথে এখন একটি ‘গুপ্ত দল’ যুক্ত হয়েছে, যাদের আচরণ ওই স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সাথে মিলে যায়।
দেশের সরকার-প্রধানের এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতার এমন অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পাল্টা অভিযোগ করে বলেন যে, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে বিএনপি। তিনি বলেন, সরকারের ‘ভুল রাজনীতি’ এবং অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। আওয়ামী আমলের গোয়েন্দা সেটআপ ব্যবহার করে এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাথে গোপন আঁতাতের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মূলত ক্ষমতার সমীকরণ, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কৌশল বলে মনে করছেন। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল দেশের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছে, এ নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য দিয়েছেন সরকার-প্রধান। একই কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতারাও। তাই সরকার-প্রধানের এ ধরনের অভিযোগকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্য বলে উড়িয়ে দিতে চান না। প্রধানমন্ত্রী যখন ভারত ও দেশের ভেতরের শক্তির আঁতাতের মাধ্যমে দেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেন, তখন বিশ্লেষকরা একে গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি করেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন এমন অভিযোগ আসে, তখন এর সত্যতা নিয়ে সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। আবার কেউ কেউ আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতে ইসলামী আঁতাতের বিষয়টিকে একবারে অবাস্তব বলেও মনে করছেন না। আবার কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ এবং শ্রমিক অসন্তোষের মতো মৌলিক সংকটগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতেই রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত বা ষড়যন্ত্র’-এর মতো সংবেদনশীল অভিযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কোন দল এককভাবে কতটুকু শক্তিশালী বা কার ভোট ব্যাংক কোন দিকে প্রবাহিত হতে পারে, তা নিয়ে বড় দলগুলোর মধ্যে চলছে হিসাব নিকাশ। বলা যায় যে এ নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংককে নিজেদের পক্ষে টানা বা প্রতিপক্ষকে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার কৌশল হিসেবেও এই আঁতাতের তত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা মনে করেন, এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসলে কোনো আদর্শিক সংঘাত নয়। এটি হলো ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও আসন্ন নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সাধারণ স্ট্র্যাটেজি।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই পাল্টাপাল্টি আঁতাতের অভিযোগ দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ। কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা দেশের সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের সাথে প্রতারণার শামিল। ক্ষমতা ধরে রাখা বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলগুলো বিভিন্ন শক্তির সাথে সমঝোতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে এটা দেশকে আরও গভীর সঙ্কটে ফেলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বলেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কীসের ভিত্তিতে ইঙ্গিত করেছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে তার ধারণা একেবারেই অমূলকও বলা যাবে না। কারণ রাজনৈতিক স্বার্থে এই দুই দলের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া সব সময়ই ছিল। অতীতে তারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট পেয়েছে জামায়াত। না হলে তো তারা দুই কোটির বেশি ভোট পাওয়ার কথা নয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারির বিষয়টিও সমর্থনযোগ্য নয়। যা অতীতে আওয়ামী লীগও করেছে। এতে একটি দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারেÑযা গণতন্ত্রেরে জন্য অশনিসংকেত।
দুই রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে খোদ সরকার-প্রধানের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্র ও আঁতাত করার অভিযোগকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন অনেকে। তারা বলেন, সত্যিই যদি কোনও দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তো শুধু বক্তব্য দিয়েই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা খোলাসা করা উচিত।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দলের আঁতাতের যে অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী করেছেন, তা খুবই উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি, সরকার-প্রধানের এই বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকার পরও শুধু জনসভায় বক্তব্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হয়। কারণ জাতি আর কোনোভাবেই পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন দেখতে চায় না।
প্রধানমন্ত্রী বলছেন, তাদের কাছে ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। তবে এ ধরনের বক্তব্যকে এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতারা। তাদের অভিযোগ, সরকারের কাছে যদি গোয়েন্দা তথ্য থেকেই থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে আওয়ামী লীগ মিছিল করে কীভাবে? নিশ্চয়ই গোয়েন্দা ব্যর্থতা আছে। অথবা তারা সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থেকেই ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষে কাজ করছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন হলো, গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন? আর বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি না থাকলে এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কেন? তিনি গোয়েন্দা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও তোলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহছানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মূলত বিরোধী দলের যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করতেই তিনি এ ধরনের কথা বলছেন। জামায়াত নয়, বরং বিএনপিই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা গুলশানে বড় ধরনের শোডাউন দিয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ। তারা কোনও ধরনের বাধার সম্মুখীন না হওয়ার কারণ হলোÑ প্রশাসনে এখনও ফ্যাসিবাদী শক্তির শক্তিশালী অবস্থান আছে। অথচ সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের ব্যবস্থা না নিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখলে সামনের দিকে সরকারকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে।
সূত্র: ইনকিলাব
