খাদ্যব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের নিবন্ধন শৃঙ্খলা ফিরবে খাবার বাজারে
অলিগলিতে হোটেল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রেস্তোরাঁ। ভবনের ছাদের ওপরও বাহারি রুফটপ রেস্টুরেন্ট। দূরপাল্লার রুটের বিরতির জায়গায় মোটেল। রাতের ঢাকায় জ্বল জ্বল করে হোটেল-রেস্তোরাঁর নামফলক। ভেতরে চা-কফি থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি খাবারের মেন্যু। চাহিদা বাড়ায় দামও বাড়ছে হরদম। তবু ছুটির দিন পরিবারসহ এসে জায়গা পাওয়াও কঠিন। অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতও এখন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বাহারি খাবারের দোকানের ব্যবসা। তবে খাবারের দোকানগুলোতে নেই কোনো তদারকি। নেই কোনো মান নিয়ন্ত্রণ। তথ্য বলছে, অনিরাপদ খাবারের কারণে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চিকিৎসা বাবদই খরচ হয় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো, কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
চা-বিস্কুট, পাউরুটি, কলা থেকে শুরু করে পরোটা, ডাল, সবজি, খিচুড়ি, ভাত, ভর্তা, ডিম, সিঙ্গারা, সমুচা, পুরি, ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া বিক্রি হয় বিভিন্ন ফুটপাতে। সেই সঙ্গে মৌসুমি ফল, শরবত, জুস ও পানীয় বিক্রিও চলে। অফিসপাড়া ও ব্যবসায়িক এলাকায় কর্মজীবী মানুষের সকালের নাশতা, দুপুরের খাবারের একটি বড় অংশের চাহিদার জোগান দেয় এসব দোকান। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও পরিবহনকেন্দ্রের আশপাশে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের জন্য ফুটপাতের খাবারের দোকান সহজলভ্য বিকল্প। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এসব দোকানের খাবার খান।
জনচাহিদা ও শৃঙ্খলা বিবেচনায় রাজধানীর এসব খাবারের দোকানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে জোর দিয়েছে সরকার। গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেট প্রকাশিত প্রবিধানমালায় নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৬ ধরনের খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ, ফলের রসের দোকান, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও মোড়কজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানি, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, রফতানি ও বিপণন কার্যক্রমও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে। পথের ধারে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু কিংবা অন্যান্য খাবার বিক্রি করা অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদেরও নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হলে নিবন্ধন করা হবে। রাস্তার পাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও নির্ধারিত শ্রেণির আমদানিকারকদের নিবন্ধন আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এজন্য নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
ফুটপাতের দোকানে খাবার বিক্রিতে বড় উদ্বেগ খাদ্য নিরাপত্তা। বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে দোকানভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়া ও নিয়মিত পরিদর্শন পরিচালনা করা সহজ হবে। নিবন্ধনের সময় বিক্রেতার পরিচয়, দোকানের অবস্থান, বিক্রি করা খাবারের ধরন ও ব্যবসার কার্যক্রমের মৌলিক তথ্য সংরক্ষণ করা হলে কোনো অনিয়মের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দোকান শনাক্ত করাও সহজ হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (আইন ও নীতি) (যুগ্ম সচিব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ইনকিলাবকে বলেন, নিবন্ধনের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায়কে একটি ডাটাবেজের আওতায় আনার প্রক্রিয়া করা হচ্ছে। খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ, ফলের রসের দোকান, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং মোড়কজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফুটপাতের খাবারের দোকান, ছোট পরিসরের যেসব ব্যবসা এতদিন তদারকির আওতায় ছিল না সেগুলোর তথ্য সংরক্ষণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিবন্ধনের মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের খাদ্য ব্যবসা রয়েছে। যারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন তাদের পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধান, তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। তবে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কোনো ফি নেয়া হচ্ছে না। নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে। আমরাও চাই বিক্রেতারা একটা সিস্টেমের মধ্যে আসুক। সূত্র: ইনকিলাব
