পরিবর্তনের পর দুই বাংলায় পুরো বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে ইতিহাসের সেরা পূজা উদযাপন পশ্চিমবঙ্গে ধুলোয় মিশেছে ঈদ আনন্দ

সরকারের পরিবর্তন ও রাজনীতির নতুন মেরুকরণে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারতের ধর্মীয় উৎসবগুলোর পরিমণ্ডলে এসেছে অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্য। একদিকে বিএনপি সরকারের অধীনে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা উদযাপন করেছেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম সর্ববৃহৎ ও আনন্দমুখর দুর্গাপূজা। অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পটভূমিতে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার গঠনের পর থেকে রাজ্যটির বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ চরম সংকট ও নিপীড়নের মুখে পড়ে ধুলোয় মিশে গেছে। বাংলাদেশে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বিজয়া দশমীতে ওয়াইজঘাটসহ সারাদেশের হাজারো জলাশয়ে মূর্তি বিসর্জনের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয় পাঁচ দিনের এই উৎসব। ঢাকঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্য এবং ভক্তদের প্রার্থনায় বিসর্জনের আয়োজন সর্বজনীন রূপ নেয়। ভক্তরা বিষাদ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান এবং নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী দেশ ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন।

এ বছরের দুর্গাপূজাকে দেশীয় গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম এবং সাধারণ নেটিজেনরা এক বাক্যে “এ যাবৎকালের সেরা ও নিরাপদ পূজা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি বাংলাদেশে বেড়াতে আসা ভারতীয় পর্যটকরা এবারের শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন উৎসব-আয়োজনের ভূইসী প্রশংসা করেছেন। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের সার্বিক তদারকিতে কেবল ঢাকায় নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশে কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান: ধুলোয় মিশেছে মুসলিমদের ঈদ আনন্দ

বাংলাদেশের এই সম্প্রীতি ও উৎসবমুখরতার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতার মসনদে বসার পর থেকেই রাজ্যের বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় বড় ধরনের আঘাত এসেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের শাসনভারের ধরন বদলে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির পরিবেশ ধসে পড়েছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মুসলিমদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায়: বিজেপি প্রতিবেশী রাজ্যটিতে সরকার গঠনের পর থেকেই কুরবানির ঈদে গরু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আইনি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। গো-সুরক্ষার নামে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তথাকথিত ‘গোরক্ষক’ বাহিনীর তাণ্ডব চরম আকার ধারণ করে। পশু বেচাকেনা ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে সাধারণ ডেইরি ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক মুসলিমদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়, যার ফলে গেল ঈদুল আজহার স্বাভাবিক আনন্দ আতঙ্কে রূপ নেয়।

কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডে গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাবে নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রশাসনিক অজুহাত দেখিয়ে ১০০ বছরের দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী এই বিশাল ঈদের জামাত আয়োজনে নজিরবিহীন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। রেড রোডের নামাজে এ ধরনের সরকারি বাধা এবং কড়াকড়ির ঘটনা রাজ্যের মুসলিম ধর্মাবলম্বী ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও গভীর বিষাদের সৃষ্টি করে। যদিও কলকাতার এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি টানা চার দিন বন্ধ রেখে এবার পূজা উদযাপন করে শুভেন্দু সরকার। বিস্ময়কর ঘটনা হলো, বাংলাদেশের যখন এই রেকর্ড ভাঙা উৎসবমুখর চিত্র, ঠিক বিপরীত রূপ দেখা গেছে শুভেন্দুর পশ্চিমবঙ্গে। চলতি বছরের অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে কলকাতার গিরিশ পার্কের চোরবাগানের উৎসবে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৯ জনের করুণ মৃত্যু ঘটে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে মন্দিরে প্রবেশ করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ও শ্বাসরোধে এই প্রাণহানির ঘটনায় উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জন্যও এ বছরের পূজা হয়ে ওঠে বিষাদের। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট