বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চার খলিফার নামে কোম্পানি: কেন গাত্রদাহ ভারতে?
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) দীর্ঘ সামরিক ঐতিহ্যে যুক্ত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। সম্প্রতি একাডেমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং প্রশিক্ষণরত অফিসার ক্যাডেটদের পেশাগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত এই নতুন ব্যাটালিয়নের অধীনে ৪টি নতুন কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় এবং চার প্রধান খলিফার স্মরণে এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে- আবু বকর কোম্পানি, উমর কোম্পানি, উসমান কোম্পানি এবং আলী কোম্পানি।
গত ১৮ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অফিসার ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই নতুন ব্যাটালিয়নের শুভ উদ্বোধন করেন।
জানা যায়, বিএমএ-তে দীর্ঘকাল ধরে পরিচালিত প্রথম ব্যাটালিয়নটি মহান মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ বীরশ্রেষ্ঠের (জাহাঙ্গীর, রউফ, হামিদ, নূর মোহাম্মদ ও মোস্তফা) নামে পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই ঐতিহ্যের পাশাপাশি নতুন ব্যাটালিয়নে মুসলিম বিশ্বের চার মহান খলিফার নাম যুক্ত করে সেনাবাহিনীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে, যা প্রশংসায় ভাসছে দেশপ্রেমিক নেটিজেনদের। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেনাবাহিনীতে প্রতিবছর রিক্রুট করা ক্যাডেটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নতুন ব্যাটালিয়নের প্রয়োজন দেখা দেয়। এছাড়া ভবিষ্যতে এখানে ‘ফাতেমা কোম্পানি’ ও ‘আয়েশা কোম্পানি’ নামে দুটি পূর্ণাঙ্গ নারী কোম্পানি গঠনেরও প্রস্তাব রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ‘ইসলামীকরণ’ জুজু ও গাত্রদাহ
বাংলাদেশের সার্বভৌম সেনাবাহিনীর এই অভ্যন্তরীণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র গাত্রদাহ ও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ‘নবভারত টাইমস’ তাদের প্রতিবেদনে শিরোনাম করেছে, ‘‘বাংলাদেশ আর্মি: ইজ জেনারেল জামান ফর্মিং অ্যান ইসলামিক আর্মি ফর বাংলাদেশ? আ কোম্পানি নেমড আফটার দ্য প্রফেটস ফার্স্ট ফোর খলিফাস।’’ অন্যদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ঘরানার পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’ এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছে, চার খলিফার নামে এই নামকরণ মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সুকৌশলে ‘ইসলামীকরণ’ প্রক্রিয়ারই সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। নিবন্ধটি লিখেছেন বাংলাদেশ নিয়ে প্রোপাগান্ডা ও অপতথ্য ছড়ানোর জন্য বিশেষ পরিচিত পাওয়া কথিত সাংবাদিক চন্দন নন্দী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লির নীতি-নির্ধারক ও তাদের অনুগত মিডিয়াগুলোর এই দৃষ্টিভঙ্গি চরম দ্বিমুখীতার শামিল। নিজেদের দেশ যখন উগ্র হিন্দুত্ববাদের জোয়ারে ভাসছে এবং খোদ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী যখন শত বছর ধরে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ও দেব-দেবীর চাদরে ঢাকা, তখন বাংলাদেশের একটি সাধারণ প্রশাসনিক নামকরণ নিয়ে তাদের এই মাথাঘামানো কেবলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। উগ্র হিন্দুত্ববাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধারণ করা আধিপত্যবাদী দিল্লি ঢাকাকে সর্বদা নিজেদের ইচ্ছেমতো ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা পুতুল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় বলেই এই গাত্রদাহ।
হিন্দু দেব-দেবী ও প্রতীকে ঠাসা ভারতীয় সেনাবাহিনী
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইউনিটের নামকরণ বা রণধ্বনি নির্ধারণ করে থাকে। এই নীতি যদি ভারতের ক্ষেত্রে বৈধ হয়, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন নয়- এই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে তোলা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শতবর্ষ ধরে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য, পৌরাণিক বীরগাথা এবং সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি এলিট ব্যাটালিয়নের নামকরণ করা হয়েছে শিবের অগ্নিমূর্তি ‘ভৈরব’-এর নামানুসারে (ভৈরব ব্যাটালিয়ন)।
এছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর একাধিক কোরের নাম সরাসরি হিন্দু পুরাণের দেব-দেবী ও অস্ত্রের সাথে যুক্ত। ১৭ কোর (ব্রহ্মাস্ত্র কোর) এর নামকরণ করা হয়েছে মহাভারত ও রামায়ণে উল্লিখিত ব্রহ্মা-প্রদত্ত অন্যতম শক্তিশালী দিব্যাস্ত্রের নামে। ২১ কোর (সুদর্শন চক্র কোর) হিন্দুদের ভগবান বিষ্ণু ও কৃষ্ণের ঐশ্বরিক অস্ত্রের নামে গঠিত, যা সনাতন ধর্মে অশুভ বিনাশের প্রতীক। ১১ কোর (বজ্র কোর) এর নামকরণ করা হয়েছে বৈদিক দেবতা ইন্দ্রের প্রধান অস্ত্রের নামানুসারে। ৩৩ কোর (ত্রিশক্তি কোর) এর নামটি হিন্দু ধর্মে মহাশক্তি বা দেবী দুর্গা, কালী ও পার্বতীর সম্মিলিত শক্তির ধারণার সাথে সম্পৃক্ত। মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের প্রতীক মহারানা প্রতাপের কিংবদন্তিতুল্য ঘোড়ার নামে ১০ কোর (চেতক কোর) এর নাম রাখা হয়েছে।
এছাড়াও, ভারতীয় সেনাবাহিনীর রেজিমেন্টাল কাঠামো ও রণধ্বনি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই হিন্দু ধর্মের গভীর প্রভাব বিদ্যমান। যেমন: রাজপুত ও বিহার রেজিমেন্টে রণক্ষেত্রে যাওয়ার সময় তাদের রণধ্বনি হলো- ‘বজরং বলী কী জয়’ (ভগবান হনুমানের জয়)। কুমায়ুন রেজিমেন্টের রণধ্বনি হলো— ‘কালিকা মাত কী জয়’ (দেবী কালীর জয়)। গাড়োয়াল রাইফেলসের রণধ্বনি- ‘বদ্রী বিশাল কী জয়’ (ভগবান বিষ্ণুর বদ্রীনাথ রূপ)। এছাড়াও আরও রণধ্বনি রয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিজস্ব ঐতিহ্য
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেশের প্রতিটি স্তরে থাকাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও এর ব্যতিক্রম নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি গৌরবময় ডিভিশন হলো ‘১৯ পদাতিক ডিভিশন’। এই ১৯ পদাতিক ডিভিশনের নীতিবাক্য বা মোটো হলো— “পবিত্র সংখ্যার বাহক” । পবিত্র কুরআনে ‘১৯’ সংখ্যাটির যে অলৌকিক গাণিতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে, তা এই নীতিবাক্যের মাধ্যমে সরাসরি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অতএব, বীরশ্রেষ্ঠদের স্মরণের পাশাপাশি মুসলিম ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল চার খলিফার নামে কোম্পানির নামকরণ করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যসম্মত একটি পদক্ষেপ। সূত্র: ইনকিলাব
