দেশের স্বার্থে সউদী আরবের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে
গত ১৪ অক্টোবর সউদী আরবে বাংলাদেশি নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মহলে সউদী আরবের সমালোচনা ও বিষোদগারের ঝড় বইয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেকে এই মৃত্যুদণ্ডকে ঠুনকো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এ শাস্তির কথা সউদী আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের না জানা কিংবা আইনি সহায়তা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর তা প্রকাশিত হলে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশস্থ সউদী রাষ্ট্রদূতের কাছে বিষয়টি জানতে চায়। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর সউদী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল। আদালত ‘তাজির’ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি ধারার অধীনে এই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে, যা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে বিচারককে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগের সুযোগ দেয়। উচ্চতর কর্তৃপক্ষ এই রায় বহাল রাখে এবং রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে তা কার্যকর করা হয়। তবে, সরকারি ঘোষণায় ঠিক কী ধরনের ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ড’ সংঘটিত হয়েছিল, সে বিষয়ে ¯পষ্ট কিছু বলা হয়নি; এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে বিভিন্ন মাধ্যমে উক্ত ছেলে-মেয়ের ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনা ২০২৩ সালের। ছেলেটি মসজিদে হারামের পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করতো। মেয়েটির সাথে যিনায় লিপ্ত হবার আগে আরেক সহকর্মীকে পাহারায় রেখেছিল। সেই সহকর্মী তা ভিডিও করে রাখে। পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যকার দর-কষাকষি বা টানাপোড়েনে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে তা কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যায়। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তিও এখন জেলে রয়েছে। অনেক সময় পরিস্থিতি বিবেচনায় আবেগের চেয়ে যুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তি ও বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিতে হয়। সউদী আরবে দুই তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ড আবেগ প্রকাশ করা ঠিক আছে, তবে আবেগকে পুঁজি করে যখন কোনো গোষ্ঠী প্রপাগাণ্ডা করে দুই দেশের সম্পর্ক বিনষ্টে উঠেপড়ে লাগে, তখন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং উক্ত তরুণ-তরুণীর পরিবারের প্রতি সমব্যাথী হয়ে কীভাবে সহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে পাশে দাঁড়ানো যায়, সেই উদ্যোগ নেয়া উচিৎ। আবেগ ও মায়াকান্নাকে একসাথে মিশ্রিত করে যাতে কেউ ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিৎ। সরকারের উচিৎ, পুরো বিষয়টি নিয়ে সউদী সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সুন্দরভাবে হ্যান্ডল করা এবং বিষয়টির গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেয়া। জনগণ যাতে বিষয়টি বুঝতে পারে। আমরা দেখেছি, জুলাই অভ্যুত্থানকে সমর্থন করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীরা সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। সেই বিক্ষোভ প্রদর্শন দেশটির নিয়ম-কানুনের পরিপন্থী হওয়ায় প্রায় ৫৭ জন প্রবাসীকে যাবজ্জীবন থেকে শুরু করে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে ফোনে কথা বলেন এবং তিনি সকলের সাজা ক্ষমা করে দেন। কূটনীতিবিদরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন, দুই তরুণ-তরুণীর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে এবং সউদী সরকারের কাছে বাংলাদেশ যে ব্যাখ্যা চেয়েছে, তা যাতে কোনো ধরনের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি না করে, এ ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। দেশের স্বার্থে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির দ্রুত সুরাহা হওয়া জরুরি।
