প্রবাসীদের সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে
ইরান আমেরিকা যুদ্ধের আঁচ কিছুটা কমে আসলেও সউদী আরবে ইরান সমর্থিত হুথিদের মিসাইল ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা ও সংকট সৃষ্টি করেছে। বিশেষত সউদী বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগারগুলো হুথিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় সউদী অর্থনীতি বড় ধরণের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সেই সাথে সউদী শ্রমবাজারের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশী শ্রমিকরাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। গতকাল প্রকাশিত দৈনিক ইনকিলাবসহ একাধিক পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সউদী বিমানবন্দরে হুতি হামলার কারণে বাংলাদেশ থেকে সউদীগামী ৮২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ১৩ হাজার যাত্রী দেশে আটকে পড়েছে। এসব যাত্রীর বেশিরভাগই প্রবাসী শ্রমিক। এরাই দেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন। বছরের পর বছর ধরে যখন দেশে বিনিয়োগে খরা, অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে মন্দা বিরাজ করছে, তখন প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। এই রেমিটেন্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম বর্ম। সউদী আরবে হুথিদের হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আঞ্চলিক বাস্তবতার অবিচ্ছিন্ন অংশ। হঠাৎ বা আকস্মিকভাবে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হহয়নি। আঞ্চলিক কূটনৈতিক বোঝাপড়া বা স্থায়ীভাবে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনায় বড় ধরণের অগ্রগতি ছাড়া এ পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন আশা করা যায়না। সউদী আরবের চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শত বিলিয়ন ডলারের কর্মযজ্ঞ থেমে থাকবে না। আশার কথা হচ্ছে, সউদী আরবে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং জেদ্দা, রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিতে বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছে সউদী কর্তৃপক্ষ। সউদী এয়ারলাইন্স বিকল্প রুটে যাত্রীদের কর্মস্থলে পৌছে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে শুধুমাত্র রিক্রুটিং এজেন্ট বা বায়রার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকে সউদী কর্তৃপক্ষের সাথে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে ৩.২ শতাংশ এবং পরবর্তী তিন বছর তিন শতাংশের নিচে থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে আভাস দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের গড় আয় কমে গেলেও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে গরীব মানুষের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। এহেন বাস্তবতায়, সউদী শ্রমবাজারের যেকোনো সংকট আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার উপর বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমনিতেই বিএনপি সরকার তার যাত্রার শুরু থেকে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে হিমশিম খাচ্ছে। তবে নিরাশ বা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অর্থপাচার রোধ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও বিনিয়োগবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারলে অর্থনীতিতে তার সুফল মিলবে। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক বাস্তবতার উপর আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতির অনেক কিছুই নির্ভরশীল। শতাধিক ফ্লাইট বাতিলের কারণে সউদীগামী আটকে পড়া কর্মীদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থায় তাদের কর্মস্থলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আকামা শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের অগ্রাধিকার ও বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তারা বেশিরভাগই গ্রামের দরিদ্র মানুষ। ফ্লাইটের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন ঢাকায় অবস্থান করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এসব বিষয় বিবেচনা করে তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ মনিটরিং সেলের মাধ্যমে সব পক্ষের সমন্বয় ও জরুরি তথ্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের স্বার্থে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ও নিয়োগ অক্ষুণ্ন রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক, আইনগত ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে পাশে থাকতে হবে। রেমিটেন্স যোদ্ধারা বিপদে পড়লে, অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবেলা করতে হবে।মানচিত্র দেখুন
