যে লাইব্রেরিতে আসতেন জসীমউদ্দীন-বন্দে  আলী মিয়া, আজ সেখানে ঝুলছে তালা

স্টাফ রিপোর্টার

একসময় যেখানে পাকা সড়ক ছিল না, নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ড যেতে পাড়ি দিতে হতো ১৩ কিলোমিটার পথ, আর রেলস্টেশন ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে—সেই প্রত্যন্ত পানিহার গ্রামেই ৮১ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে একটি লাইব্রেরি। মাটির দেয়াল আর টিনের চালার ছোট দুটি ঘর থেকে যার যাত্রা শুরু, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই হয়ে উঠেছিল কবি-সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও জ্ঞানপিপাসু মানুষের মিলনস্থল। নাম—‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি’। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দিগরাম ইউনিয়নের পানিহার গ্রামের এই লাইব্রেরি শুধু একটি পাঠাগার নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষাচর্চা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। শতবর্ষের কাছাকাছি পুরোনো বই, সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা ও নানা দুর্লভ গ্রন্থের সংগ্রহ নিয়ে একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিতি পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কবি জসীমউদ্দীন, কবি বন্দে আলী মিয়া, তৎকালীন মন্ত্রী ও বিভিন্ন গুণীজনের পদচারণায় মুখর ছিল এর প্রাঙ্গণ। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও তুলে ধরা হয়েছিল পানিহার লাইব্রেরির কথা। কিন্তু সময় বদলেছে। একসময় যেখানে প্রতিদিন পাঠকের ভিড় থাকত, আজ সেখানে অধিকাংশ সময়ই ঝুলে থাকে তালা। পুরোনো বইয়ের তাকগুলোতে ধুলো জমে আছে। অনেক মূল্যবান বইয়ের মলাট ক্ষয়ে গেছে, পাতা নষ্ট হওয়ার পথে। স্বেচ্ছাশ্রমে লাইব্রেরির কার্যক্রম ধরে রেখেছেন একজন লাইব্রেরিয়ান। তবু স্থানীয় মানুষের আশা, যথাযথ সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ পেলে আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠান।

পানিহার গ্রামের সন্তান শেখ এনায়েত উল্লাহ পণ্ডিতের জন্ম ১৯০০ সালে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ। শিক্ষার জন্য মাত্র ১০ বছর বয়সে, ১৯১০ সালে তিনি পাড়ি জমান ভারতের মুর্শিদাবাদে। সেখানে ভর্তি হন নবাব বাহাদুর হাইস্কুলে। পড়াশোনা শেষে এন্ট্রান্স পাস করে ওই এলাকায় শিক্ষকতাও শুরু করেন। কিন্তু বাবার মৃত্যু তার জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় ১৯২৮ সালে তিনি নিজ গ্রাম পানিহারে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি দেখতে পান, গ্রামের অধিকাংশ মানুষের শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বই পড়ার সুযোগও ছিল খুবই কম। প্রত্যন্ত এই জনপদের মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার তাগিদ থেকেই শুরু হয় তার নতুন উদ্যোগ।

তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দিতে শুরু করেন। শিক্ষিতদের বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। নিজের সংগ্রহের বই গ্রামের মানুষের হাতে তুলে দিতেন। কেউ বই নিয়ে যেতেন, পড়া শেষ হলে আবার ফিরিয়ে দিতেন। এভাবেই নিজের বাড়ির একটি কাঠের আলমারিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তার পারিবারিক লাইব্রেরি। প্রথমদিকে সেখানে বিভিন্ন লেখকের প্রায় ১০০টি উপন্যাস ছিল। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বইয়ের সংখ্যা এবং পাঠকের আনাগোনা। একসময় এনায়েত উল্লাহ বুঝতে পারেন, নিজের বাড়ির মধ্যে এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে এর সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে না। তখনই জন্ম নেয় একটি উন্মুক্ত গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে ১৯৪৫ সালে নিজের বাড়ির সামনে প্রায় দুই শতক জমির ওপর মাটির দেয়াল ও টিনের চালা দিয়ে দুটি ঘর নির্মাণ করেন শেখ এনায়েত উল্লাহ। সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি’। সেই সময় পানিহারের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। গ্রাম থেকে বাসস্ট্যান্ড প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং রেলস্টেশন প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ছিল। তারপরও বইয়ের আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসতেন। শুধু বই পড়াই নয়, লাইব্রেরিটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে স্থানীয় মানুষের শিক্ষাচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পাঠচক্র, আলোচনা, বই পড়া এবং নানা ধরনের জ্ঞানচর্চায় মুখর থাকত এর পরিবেশ। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর পানিহার লাইব্রেরি সরকারি স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৮ সালে ‘পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি’ সরকারি মঞ্জুরি লাভ করে। সে সময় এটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। বছরে ৫০০ টাকা করে সরকারি অনুদানও দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একসময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় লাইব্রেরিটি বেশ ভালোভাবেই চললেও সময়ের সঙ্গে সেই ধারাবাহিকতা কমে যায়। বর্তমানে নিয়মিত সরকারি অনুদান নেই। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও চাঁদার ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে। পানিহার লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু এর বইয়ের সংগ্রহ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দীর্ঘ ইতিহাস। তৎকালীন মন্ত্রী প্রভাস লাহিড়ী, ধীরেন দত্ত, আইনুদ্দীন চৌধুরী, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কবি বন্দে আলী মিয়াসহ দেশ-বিদেশের অনেক কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক এই লাইব্রেরিতে এসেছেন।

কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকরাও পুরোনো বই ও সাময়িকীর সন্ধানে এখানে এসেছেন। কারও উদ্দেশ্য গবেষণা, কেউ এসেছেন দুর্লভ বই দেখতে, আবার কেউ প্রত্যন্ত গ্রামে এমন একটি ঐতিহাসিক পাঠাগারের অস্তিত্ব দেখে যেতে।

জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র উপস্থাপক হানিফ সংকেতও পানিহার লাইব্রেরির কথা তার অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। একসময় লাইব্রেরিটির জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদানের ব্যবস্থাও হয়েছিল। এছাড়াও পানিহার গ্রামের সঙ্গে তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাসও কোনো কোনো সূত্রে জড়িয়ে আছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ‘রানী’খ্যাত তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ইলা মিত্র আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় পানিহার গ্রামে আসতেন এবং এ লাইব্রেরিতে সময় কাটাতেন। তবে ইলা মিত্রের লাইব্রেরিতে যাতায়াতের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর পক্ষে প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষিত আছে কি না, তা আরও অনুসন্ধানের বিষয়।

পানিহার লাইব্রেরিতে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। লাইব্রেরির হিসাব অনুযায়ী, সংগ্রহে রয়েছে ৭ হাজার ৩১৫টি বই। লাইব্রেরিয়ান মোয়াজ্জেম হোসেনের হিসাবে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজারের কাছাকাছি। সাময়িকপত্র, বাংলা অনুবাদ, সাহিত্য, উপন্যাস, কবিতা, কাব্য, বিশ্বকোষ, ধর্মীয় গ্রন্থ, নাটক, শিশুসাহিত্য, জীবনী, ইতিহাস, রহস্য উপন্যাস, গোয়েন্দা সাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই রয়েছে এখানে। সংগ্রহে রয়েছে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বহু পুরোনো বই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুরোনো গ্রন্থের পাশাপাশি দুই বাংলার নানা পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীর সংখ্যাও সংরক্ষিত আছে। ‘শনিবারের চিঠি’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘সাপ্তাহিক নতুন দিন’সহ বিভিন্ন পুরোনো সাময়িকী এই সংগ্রহকে আরও মূল্যবান করে তুলেছে। প্রতিষ্ঠাতা শেখ এনায়েত উল্লাহ কলকাতাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক বই সংগ্রহ করেছিলেন। তার সংগ্রহের অনেক বই একসময় চামড়ার বাঁধাই করা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সেই বাঁধাই ক্ষয়ে গেছে। কোথাও মলাট আলগা হয়ে গেছে, কোথাও পাতা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। পুরোনো কাঠের আলমারিতেও ধরেছে ঘুণ। ফলে এই দুর্লভ সংগ্রহ সংরক্ষণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাকালীন মাটির ঘরটি এখনো টিকে আছে। তবে সময়ের ক্ষত তার শরীরে স্পষ্ট। কোথাও মাটির দেয়াল খসে পড়েছে, কোথাও ভেঙে পড়ার উপক্রম। একসময় যে ঘরে মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে ইট-বালু-সুরকির পাকা একতলা ভবন। বর্তমানে সেখানেই সংরক্ষিত রয়েছে লাইব্রেরির অধিকাংশ বই ও সাময়িকী। গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহান পানিহার পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করে এটিকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।তার মতে, একসময় এই গ্রামীণ লাইব্রেরিটি ছিল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে এসে জ্ঞানের চর্চা করতেন। বই পড়া, আলোচনা, পাঠচক্রসহ নানা কার্যক্রমে লাইব্রেরিতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করত। তবে বর্তমানে নিয়মিত কার্যক্রম না থাকায় সেই প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট