সম্পাদকীয়

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে

দেশে কৃষিজমির পরিমাণ দিনদিন কমছে। খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান উৎস কৃষিজমি অকৃষিখাতে চলে যাচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়। তবে এর ফলাফল যে ভয়াবহ হবে, তা কৃষিবিদরা বরাবরই বলে আসছেন। কৃষিজমি কমে গেলে ধান, গম, শাকসবজি, ফলফলাদিসহ মানুষের বেঁচে থাকার খাদ্যপণ্যের উৎপাদন কমে খাদ্যসংকট দেখা দেবে। দেশে খাদ্য আমদানি নির্ভর হয়ে পড়তে পারে। একদিকে কৃষিজমি কমছে, আরেক দিকে জনসংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গতকারণেই, স্বল্প পরিমাণ কৃষিজমি বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতে পারবে না। ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে। মৃত্তিকা স¤পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়ন, দ্রুত শিল্পায়ন, বসতি স্থাপন, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদীভাঙনে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০৭ একর জমি শিল্পায়ন, নগরায়ন, বসতবাড়ি ও সড়ক নির্মাণের কাজে চলে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশের ২ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়া বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। কৃষিজমি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ, জনসংখ্যার সঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে বসতি বৃদ্ধি। এই ক্রমবর্ধমান বসতির ফলে ফসলি জমি কমছে। শিল্পায়নের কারণে কৃষিজমি আরো কমছে। অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে তা কৃষিজমি রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে কিনা, সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর নদীভাঙনেও কৃষিজমি এবং বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বসতভিটা হারানো মানুষ অন্যত্র গিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করছে। এতেও কৃষিজমি কমছে। প্রতিবছর নদীভাঙন ঠেকাতে সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করলেও তা ঠেকাতে পারছে না। এখাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের গল্প বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। সরকারের অর্থ নদীভাঙনের সাথে ভেসে যায়। এর কোনো প্রতিকার নেই। কৃষিখাত শুধু ধান-চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে মৎস্যচাষ, ডেইরি, পোল্ট্রিও জড়িত। একটার সাথে আরেকটার সম্পর্ক রয়েছে। দেখা যায়, বসতি বা শিল্পায়ন করতে গিয়ে কৃষিজমিতো বটেই পুকুর ও জলাশয়ও ভরাট করা হচ্ছে। এতেও এসব খাতের উৎপাদন সংকুচিত হচ্ছে। দেশে খাদ্যসংকট না থাকলেও যে হারে কৃষিজমি কমছে, তাতে সংকট দেখা দিতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এমনিতেই প্রতিবছর জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। এতে অনেক সময় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় ঘাটতি দেখা দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, যেকোনো একটি খাদ্যপণ্যের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে দেশে হাহাকার তৈরি হয়। আমরা দেখেছি, ২০১৯ সালে ভারি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আকাশছোঁয়া দামবৃদ্ধি ও ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। তখন পাকিস্তান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়। আমাদের মতো ছোট দেশে খাদ্যনিরাপত্তা না থাকলে কী পরিস্থিতি হয়, তার নজির রয়েছে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ ইতিহাস হয়ে রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির উপর জোর দেয়া হয়। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, সড়ক, বসতভিটা ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে কৃষিজমি কমতে থাকে। কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার পর ধারাবাহিকভাবে দেশে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে একই সময়ে কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কৃষিজমি কমতে থাকলে একসময় উৎপাদনও কমে যাবে। খাদ্যনিরাপত্তা ভেঙে পড়বে। আমরা দেখেছি, ইউক্রেন ও ইরানযুদ্ধে দেশ দুটিতে খাদ্যসংকট দেখা দেয়নি। ইরান তো স্যাংশনের মধ্যে রয়েছে। তারপরও দেশ দুটিতে খাদ্যসংকট না দেখা দেয়ার কারণ হচ্ছে, তাদের আভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন। অধিক কৃষিজমি থাকায় তারা উৎপাদন করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আমাদের দেশে যেভাবে কৃষিজমি কমছে, তা খাদ্যনিরাপত্তাকে অনশ্চিত করে তুলছে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিজমি রক্ষা করতেই হবে। কৃষিবিদদের মতে, কৃষিজমি রক্ষায় গ্রামীণ এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া উচিৎ। কৃষিজমি রক্ষা করে কীভাবে শিল্পায়ন, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা যায়, তা নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি, শিল্প, ভূমিমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। ভিয়েতনামে কৃষিজমি রক্ষায় একজেলা থেকে আরেক জেলায় যাওয়ার জন্য এলিভেটেড সড়ক বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করার নজির রয়েছে। এতে অনেক কৃষিজমি রক্ষা পেয়েছে। আমাদেরও কৃষিজমি রক্ষা করে কীভাবে সড়ক নির্মাণ করা যায়, এ নিয়ে ভাবতে হবে। স্বল্প জমিতে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তার ওপর জোর দিতে হবে। ইতোমধ্যে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। একফসলি জমিকে কীভাবে একাধিক ফসলি করে তোলা যায়, সেদিকে জোর দিতে হবে। সম্প্রতি নীলফামারিতে একফসলি জমিকে তিন ফসলি করার সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সারাদেশের কৃষিজমিকে এভাবে একাধিক ফসলিজমিতে পরিণত করার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমি রক্ষা এবং তার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট