বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব শীতেও বাড়তে পারে গরম, ৬ শতাধিক অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা

এল নিনোর প্রভাবে আগামী শীতেও বাড়তে পারে গরমের তীব্রতা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে এল নিনো শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, এর প্রভাবে বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত মৃত্যুর পূর্বাভাস নয়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর মডেলভিত্তিক হিসাব।   ডব্লিউএমও গত ৩ সেপ্টেম্বর জেনেভা থেকে দেওয়া পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এল নিনো ২০২৬ সালের শেষ দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশে কতটা ঝুঁকি: গত ২২ সেপ্টেম্বর ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬০০ জনের বেশি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। এর মধ্যে খুলনায় প্রায় ৩১০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। গবেষণার এই সংখ্যা নিশ্চিতভাবে কতজন মারা যাবেন, তার পূর্বাভাস নয়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর মডেলভিত্তিক হিসাব। এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের একটি অংশ, যার ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো ও লা নিনা হলো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার বিপরীত দুই অবস্থা। এল নিনো হলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হয়ে যায়। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাভাবিক আবহাওয়ার ধরন বদলে যেতে পারে। কোথাও বেশি গরম, কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে লা নিনা হলো এর প্রায় বিপরীত অবস্থা। এ সময় ওই অঞ্চলের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় এল নিনোর বিপরীত ধরনের আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। শুধু এল নিনোই দায়ী নয়: এল নিনোর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন বদলে যায়। ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা আবার কোথাও অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে শুধু এল নিনোকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রার ভিত্তিই আগের তুলনায় বেশি হয়েছে। এর ওপর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। তবে এই আশঙ্কার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘গরমে আমি তো এত মারা যাওয়া কখনো দেখিনি বাংলাদেশে।’ তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ছে। এখন কেউ তাপমাত্রা কমাতে পারবে না। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তা যেন ২ ডিগ্রির বেশি না বাড়ে, সে বিষয়ে বিশ্বের ৯৮টি দেশ একমত হয়েছে। এল নিনো ও লা নিনো সম্পর্কে মানুষ জানলেও কেন এই দুই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এল নিনো এলে গরম বাড়ে, লা নিনো এলে গরম কমে এটা সবাই এখন জানে।’আইনুন নিশাত বলেন, এল নিনো এখন সক্রিয় থাকায় তাপমাত্রা বেশি হতে পারে। কিন্তু এর কারণে বাংলাদেশে কী পরিমাণ গরম পড়বে বা এতে কত মানুষ মারা যাবে, তা বলা সম্ভব নয়। তার মতে, এটি একটি অবাস্তব ব্যাখ্যা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সামনে আরও তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো সক্রিয় থাকবে, এটা সঠিক। এতে তাপমাত্রার তীব্রতা এবং গরমের অনুভূতি বেশি থাকবে, সেটাও ঠিক। তবে এল নিনোর প্রভাব সব শহর বা দেশে একই রকম হবে না।তিনি বলেন, সাধারণত এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল ছাড়াও প্রায় সারা বছর অতিরিক্ত গরম পড়তে পারে, শীতকালের মেয়াদ কমে আসতে পারে। আবার স্বল্প সময়ের জন্য অনেক বেশি বৃষ্টির প্রবণতাও দেখা যায়। এর মধ্যে কোনটি কোন দেশের ওপর পড়বে বা কোনো দেশে সবগুলোই পড়বে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘এই গরমে মানুষ মারা যাবে কিনা তা এইভাবে ঢালাও বলা সম্ভব না।’ প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিবেদনে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর কথা আসে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো হাসপাতালেই সঠিক তথ্য বা ডাটা নেই। অনেক সময় হিটস্ট্রোক বলা হলেও পরে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল।তার মতে, তাই মৃত্যুর এই হিসাব নিশ্চিত করে বলা উচিত নয়। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জলবায়ু ও আবহাওয়া নিয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট