অহংকার একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
অহংকার মানুষের এমন একটি দুর্বলতা, যা তাকে নিজের ক্ষমতা, জ্ঞান ও সম্পদ নিয়ে গর্বিত করে এবং অন্যকে তুচ্ছ ভাবতে শেখায়। ব্যক্তি থেকে সমাজ-সব স্তরেই অহংকারের প্রভাব বিস্তার লাভ করে। যখন কোনো জাতি সত্যকে অস্বীকার করে, দুর্বলদের অধিকার হরণ করে এবং নিজেদের শক্তিকে চিরস্থায়ী ভাবতে শুরু করে তখনই তার পতনের বীজ রোপিত হয়। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে কঠোরভাবে অংকারের নিন্দা করা হয়েছে। অতীতে বহু জাতি অংকারের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে; যার বিবরণ কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছে,“তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না। আর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশি, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক-অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”(সূরা আন-নিসা: ৩৬) অহংকারের মূল সমস্যা শুধু বাহ্যিক আচরণ নয়; এটি সত্য গ্রহনের পথও বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদীস বিশেষভাবে প্রনিধান যোগ্য। হাদীসটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অনুপরিমান অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি বললো,‘মানুষ তো পছন্দ করে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং জুতা সুন্দর হোক।’ তিনি (সা.) বললেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন। অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা।”(সহীহ মুসলিম: ৯১, কিতাবুল ঈমান) রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রদত্ত সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্যেন্দর্য বা পরিচ্ছন্নতা নয় বরং, বরং সত্যকে অস্বীকার করা ও মানুষের মর্যাদা খাটো করাই অহংকার।
পবিত্র কুরআনে ফেরাউনের অহংকারের ভয়াবহ পরিণতির কথা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সে নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভাবত, মুসা (আ.)-এর আহবান প্রত্যাখ্যান করে বনি ইসরাঈলের উপর জঘণ্য নির্যাতন করত। শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারেনি; সমুদ্রে তার ডুবে মরার ঘটনা পবিত্র কুরআনে সতর্কবার্তা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, সূরা ইউসুফ ৯০-৯২ আয়াত দ্রষ্টব্য। আদ ও সামুদ জাতি শক্তি ও উন্নতি নিয়ে গর্ব করেছিল। তারা আল্লাহর রাসূলদের অস্বীকার করে সীমালঙ্ঘন করেছিল, ফলে তাদের সভ্যতা ও জনপদ মহান আল্লাহ ধ্ংস করে দেন। সূরা আল-হাক্কাহ, ৪-৮ আয়াত দ্রষ্টব্য। এসব ঘটনা প্রমান করে যে, প্রযুক্তি সম্পদ বা সামরিক শক্তি কোনো জাতিকে পতন থেকে রক্ষা করতে পারে না, যদি তার নেতৃত্ব অন্যায় ও আত্মম্ভিরতায় ডুবে যায়। কোনো সভ্যতার অবক্ষয় শুরু হয় যখন তার শাসকরা সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, ধনীরা দরিদ্রদের হক অস্বীকার করে, শিক্ষিতরা সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা করে এবং ক্ষমতাবানরা আইনের ঊর্ধে থাকার দাবি করে। অহংকার মানুষকে নিজের ভুল দেখতে দেয় না; ফলে তার অন্যায় সংশোধনের সুযোগ থাকে না। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে, ন্যায়বিচার হারিয়ে যায়, মানুষের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয় এবং সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর এই বিভাজনই একটি সভ্যতাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে তার পতনকে ত্বরাম্বিত করে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,“পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করোনা; নিশ্চয়ই তুমি কখনো ভূমিকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পর্বতের সমান হতে পারবে না।”(সূরা আল-ইসরা: ৩৭) বাংলাতে আয়াতের সমার্থক একটা প্রসিদ্ধ প্রবাদ আছে,“অহংকার পতনের মূল”। মহান আল্লাহ আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনকে অহংকার মুক্ত করুন!
লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
