রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর রাজশাহী রেল স্টেশনে ব্যাপক ভাংচুর, আরএনবির ৪ সদস্য বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

স্টাফ রিপোর্টার

রেল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনায় রেলস্টেশনে বিক্ষোভ ও ভাংচুর করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত রোববার রাত ১২টা থেকে দেড়টায় শিক্ষার্থীরা রেল স্টেশনের যাত্রীদের বসার বেঞ্চ, বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ভাংচুর করে। রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে। রাজশাহী রেলস্টেশনে আটকে পড়েন যাত্রীরা। ঘটনার সময় রাত একটার দিকে রাসিক প্রশাসক ও নগর পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এ ঘটনায় রেলের নিরাপত্তাবাহিনীর চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা যায়, রোববার রাত ৯টার দিকে রাবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী তার চাচাকে আনতে রাজশাহী রেলস্টেশনে যান। এ সময় ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কথাকাটাকাটি হয়। সেখানে আইয়ুব আলী গেলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে আহত আইয়ুব আলীকে পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুহূর্তে এই খবর পৌঁছে যায় রাবিতে। এতে শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে প্রথমে রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে রাত ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেল স্টেশনে উপস্থিত হয়ে ভাংচুর শুরু করে। ভেঙ্গে ফেলা হয় রেল স্টেশনের যাত্রীদের বসার বেঞ্চ, বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। মূলত প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। পরে রাতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়ে অবস্থান নেয়। চলে ঘন্টা ব্যাপি ভাংচুর। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানসহ প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষক স্টেশনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত করেন। রাত ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা স্টেশন ত্যাগ করে।

এরআগে হাসপাতালে আইয়ুব আলীকে দেখতে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম ও প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এসময় উপাচার্য আইয়ুবকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানান। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিষয়টি রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার ও পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপককে বিষয়টি জানান তিনি। এসময় উপাচার্য বলেন, এর আগে দুই-তিনবার রাবির শিক্ষার্থীদের রেলওয়ের কর্মচারীরা মারধর করেছে। এসব ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তাঁরা।

এদিকে শিক্ষার্থীর ওপর হামলার প্রতিবাদে এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। দাবি মানা না হলে প্রতিটি ট্রেন থেকে দুজন করে কর্মচারী তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। মূলত আম্মারের এমন উস্কানিমূলক ফেসবুক পোস্টের কারণেই রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাবি রেলস্টেশনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তাঁরা রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন।

রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, রেললাইন ও স্টেশনকে কেন্দ্র করে রেলওয়ের কর্মচারী, কর্মকর্তা ও টিটিইদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বারবার হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই তাঁরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। রাতের মধ্যে সমাধান না এলে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহযোগিতা না করলে আন্দোলন আরও কঠোর করার কথা জানান তিনি।

এদিকে, রাজশাহী রেলস্টেশনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরএনবির চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজশাহী শাখার চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বরখাস্ত হওয়া চার সদস্য হলেন মো. আরিফ হোসেন, মো. রোকন উদ্দীন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন।

প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাঁদের কথা শুনেছেন। পরে তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এখন সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, যাতে নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।

এছাড়াও ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকে বিভাগীয় কমিশনার, পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানান, পুরো ঘটনার তদন্ত করা হবে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে। ইতিমধ্যে এ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। চারজন কর্মচারিকে বরখাস্ত সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল বিভাগ।

অপরদিকে রাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় আনসার সদস্যদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। গতকাল সোমবার বাহিনীর সহকারী পরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি এ ঘটনায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আনসার সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি সঠিক নয় এবং প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট