মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসে যেভাবে কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন আইয়ুব বাচ্চু
গত ১৬ আগস্ট ছিল বাংলা ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গিটারবাদক ও সুরকার আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ ৬৪ বছরে পা দিতেন তিনি। ১৯৬২ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নিয়েছিলেন সংগীতের এই অমর শিল্পী। মাত্র ৫৬ বছরের জীবনে আইয়ুব বাচ্চু বাংলা সংগীতকে যা দিয়ে গেছেন, তা তাকে করে তুলেছে অনন্য। গিটার হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার পরিবেশনা যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, তেমনি তার কণ্ঠের গান ছুঁয়ে যেত শ্রোতাদের হৃদয়। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন ‘বস’, কারও কাছে ‘স্যার’, আর সংগীতাঙ্গনে তিনি পরিচিত ছিলেন গিটারের জাদুকর হিসেবে।
১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর প্রতিভা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা হিসেবে। সোলসসহ বিভিন্ন ব্যান্ডে কাজ করার পর ১৯৯০ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, যা পরবর্তী সময়ে ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ বা এলআরবি নামে পরিচিতি পায়। মূলত রক সংগীতের শিল্পী হলেও আইয়ুব বাচ্চু নিজেকে কোনো একটি ঘরানায় আটকে রাখেননি। আধুনিক গান, লোকগীতি ও চলচ্চিত্রের গানেও তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। তার কণ্ঠ, সুর ও গিটারের অনন্য মিশেলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তবে হাসি-আনন্দের আড়ালে আইয়ুব বাচ্চুর ভেতরে ছিল গভীর অভিমান ও বেদনা। কাছের মানুষদের ভাষ্য, তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও অভিমানী। নিজের কষ্ট সব সময় প্রকাশ করতেন না। কখনো কখনো সেই না বলা কথাগুলোই উঠে এসেছে তার গান ও সুরে।
মায়ের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। মায়ের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা বিভিন্ন সময় তিনি নিজেই বলেছেন। মায়ের চলে যাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হয়ে ছিল। সহশিল্পীদের সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘটনাও তাকে কষ্ট দিত। ব্যান্ডকে তিনি শুধু একটি সংগীতদল হিসেবে দেখতেন না, বরং নিজের আরেকটি পরিবার মনে করতেন। তাই প্রিয় সহশিল্পীদের কেউ দল ছেড়ে চলে গেলে তা তাকে মানসিকভাবে আহত করত। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ছিল গিটার। তিনি বলতেন, গিটারই তার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। জীবনের বড় একটি অংশ তিনি গিটার সংগ্রহ ও বাজানোর পেছনে ব্যয় করেছেন। বিভিন্ন দেশে গিয়ে নামী গিটারের দোকানে ঘুরেছেন, নতুন গিটার সংগ্রহ করেছেন। তার কাছে এসব গিটার ছিল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, আবেগ ও ভালোবাসার অংশ।
জীবনের শেষদিকে নিজের গিটারগুলো নিয়ে দেশব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন, প্রতিভাবান গিটারবাদকেরা তার প্রিয় গিটারগুলো বাজাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাননি।
২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট নিজের শেষ জন্মদিন পালন করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। ঘরোয়া সেই আয়োজনে কাছের মানুষদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন তিনি। সেদিনও নতুন কিছু করার স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এমন কিছু গান করতে চান, যা আগে কখনো করেননি। নিজেই লিখবেন, সুর করবেন এবং গাইবেন। কিন্তু সেই জন্মদিনের মাত্র দুই মাস পর, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ সালে হঠাৎ করেই না ফেরার দেশে চলে যান বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই কিংবদন্তি।
প্রসঙ্গত, কিংবদন্তি এই গিটারশিল্পীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবার প্রকাশ পাচ্ছে তার ২০টি কালজয়ী গান। নতুন সংগীতায়োজনে গানগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে বিশেষ অ্যালবাম ‘উত্তরাধিকার’। ইকবাল আসিফ জুয়েলের মাস্টারিংয়ে তৈরি অ্যালবামটিতে থাকছে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘নীল বেদনা’, ‘গতকাল রাতে’, ‘চাঁদ মামা’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মাধবী’ ও ‘বাংলাদেশ’সহ আরও কয়েকটি গান। সূত্র : জাগো নিউজ
