অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

ডারউইনে প্রথম দিন শেষে যে অভাবনীয় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি বাংলাদেশ, তা বাস্তবে রূপ নিল চতুর্থ দিন মধ্যাহ্নভোজনের পর। প্রতাপশালী অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেল টাইগাররা। জয়টা এতটাই দাপুটে যে, ম্যাচের প্রতিটা সেশনেই আধিপত্য দেখিয়েছে সফরকারীরা। অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ৫৭ রানের লক্ষ্য নাজমুল হোসেন শান্তর দল পেরিয়ে যায় ১৪.২ ওভারে। চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল হক। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনোদিন টেস্ট জেতেনি শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তানও সেখানে সর্বশেষ টেস্ট জিতেছে সেই ১৯৯৫ সালে। এ থেকেই বোঝা যায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই জয়ের মহত্ত্ব কতখানি। সব মিলিয়ে টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। লক্ষ্য তাড়ায় প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান এবার রানের খাতা খুলতে পারেননি। লাইন মিস করে এই ওপেনার বোল্ড হন জশ হেইজেলউডের বলে। দলীয় ৪ রানে উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তবে জয় নিয়ে বাংলাদেশকে ভাবনায় পড়তে হয়নি। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যান আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। সাদমান ৪২ বলে ২৫ এবং মুমিনুল ৩৯ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। অথচ জিম্বাবুয়ে সফরে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারের পর বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় পা রেখেছিল আন্ডারডগ হিসেবেই। এসে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে স্থানীয় দলের বিপক্ষেই স্রেফ ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়ার অস্বস্তিতে পড়ে টাইগাররা। সেখান থেকে বিশ্বসেরা বোলিং লাইন-আপের বিপক্ষে যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাটিং করেছে তা প্রসংশা কুড়িয়েছে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের। টেস্ট ক্রিকেটের ইহিতাসে এই প্রথম কোনো ম্যাচে বিশেষজ্ঞ চার বোলার খেলেছেন যাদের প্রত্যেকের নামের পাশে কমপক্ষে ৩০০ উইকেট। এমন বিশ্বসেরা বোলিং লাইনআপের বিপক্ষে লড়াই করে ম্যাচ জেতা বাংলাদেশের লড়াকু মানসিকতারই পরিচয় বহণ করে।

হাসান মাহমুদের ৫৫ রানে ৬ উইকেটে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। জবাবে তানজিদের ১০১ ও শান্তর ৮৫ এবং শেষ দিকে লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে মেহেদি হাসান মিরাজের  ধ্রুপদী ৬৫ রানের ইনিংসে ২২৮ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। এরপর থেকে কেবল জয়ের স্বপ্নই দেখেছে টাইগাররা। চতুর্থ দিন সেটাকে বাস্তবে রূপ দেন মিরাজ। ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৫ উইকেট। ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া কোনোমতে ইনিংস হার এড়িয়ে বাংলাদেশকে মামুলি লক্ষ্য দিতে পারে।

ম্যাচ শুরুর আগে আলোচনা চলছিল বাংলাদেশ এই ম্যাচ তৃতীয় দিনে নিতে পারবে কি না। টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান এক নম্বরে, আর বাংলাদেশ নয়ে। এমন আলোচনা সমীকরণের মধ্যেই অবিশ্বাস্যভাবে টানা ১১টি সেশনেই দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। পুরো ম্যাচে করতালি দেওয়ার খুব একটা সুযোগ পানি অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকরা। চতুর্থ দিন সেই উপলক্ষ্য তারা পেয়েছে কেবল দুবার। সেটাও পরাজয়ের ক্ষণে এসে। প্রথমবার ২২৮ রান টপকে ইনিংস হার এড়িয়ে, দ্বিতীয়বার গ্রিনের সেঞ্চুরির সময়। তবে দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার ২৮৪ রানের ইনিংসে গ্রিনের ১০৪ রান কেবলই সান্ত্বনা। চতুর্থ দিন সকালে উইকেট থেকে টার্ন ও বাউন্স আদায় করে প্রথম সেশনেই তিন উইকেট তুলে নেন মিরাজ। আউট করেন অ্যালেক্স কেয়ারি, বাউ ওয়েবস্টার ও প্যাট কামিন্সকে। আর লাঞ্চের পর অস্ট্রেলিয়ার শেষ উইকেট তুলে নিয়ে সব মিলিয়ে ৬৬ রান দিয়ে টেস্টে ১৫তম বারের মতো ৫ উইকেটের স্বাদ নেন মিরাজ। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়ার পর এবার ৩ উইকেট নেন হাসান। সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ ও অলরাউন্ড নৈপুণ্েয উজ্জ্বল মিরাজকে পেছনে ফেলে তিনিই জিতেছেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। আগামী শনিবার ম্যাকাইতে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৯৮। বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪২৬। অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: (আগের দিন ১৬১/৪) ৯৫.১ ওভারে ২৮৪ (গ্রিন ১০৪, কেয়ারি ৩০, ওয়েবস্টার ৫, কামিন্স ৮, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫, হেইজেলউড ০*; তাসকিন ১৮-৩-৬৬-১, হাসান ১৯-৩-৫৬-৩, ইবাদত ৮-০-৩৮-০, তাইজুল ১৭-১-৫১-১, মিরাজ ৩৩.১-৬-৬৬-৫)।

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৫৭) ১৪.২ ওভারে ৫৭/১ (সাদমান ২৫*, তানজিদ ০, মুমিনুল ৩০*; স্টার্ক ৪-০-১৫-০, হেইজেলউড ৩-১-৫-১, লায়ন ৫-০-২৩-০, ওয়েবস্টার ২.২-০-১২-০)। ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী। ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ। সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট