নির্দলীয় ভোটের সমীকরণে ইসির স্থানীয় নির্বাচন প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ও আইনি প্রস্তুতি জোরদার করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন, আচরণবিধি ও বিভিন্ন ধারা সংস্কারের কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে কমিশন। একই সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে জোর প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন প্রার্থী ও দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ইসি সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচনের সূচনা করতে চায় কমিশন, যা এখন সরকারের সবুজসঙ্কেতের অপেক্ষায় রয়েছে।
দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত থাকায় স্থানীয় রাজনীতির চেনা সমীকরণ অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন কেবল এক সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ে দলগুলোর শক্তি-পরীক্ষার প্রধান মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইসি বেশ কিছু নীতিমালা ও বিধিমালার খসড়া তৈরি করে মতামত গ্রহণ ও গেজেটের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে।
কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো নির্বাচনেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না; পুরো নির্বাচন হবে সনাতন কাগজের ব্যালটে। এ ছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার বিধান বাদ দিয়ে এবার প্রার্থীদের সরাসরি (সশরীরে) মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ। অন্য দিকে বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর চিত্র ও মেয়াদোত্তীর্ণের হালচাল : সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার মো: আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা বর্তমানে কমিশনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তবে তফসিল ঘোষণার আগে আইনি সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আবহাওয়াজনিত ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কয়েক ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
এখন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ৪,৫৯৯টি; ২০২১ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া বহু ইউপির আইনি মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। প্রায় ৩,৬০০টি ইউপি আগস্ট-অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচনের যোগ্য হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ ৪৯৫টি; পর্যায়ক্রমে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাধীন। পৌরসভা ৩৩০টি; প্রথম ধাপের বেশ কিছু পৌরসভা মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদের শেষপ্রান্তে রয়েছে। আর সিটি করপোরেশন ১৩টি। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ মোট ১৩টি সিটি করপোরেশন ১০-১২ মাসের কর্মপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই গ্রামীণ সড়ক পুনর্র্নিমাণ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং এলজিইডির হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ফলে এই নির্বাচন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
অক্টোবর টার্গেটে ইসির কারিগরি ও আইনি সংস্কার : নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হালনাগাদ ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে, যা আগস্টের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে প্রাথমিক সমন্বয় শুরু হয়েছে।
ব্যালট ও জামানত : ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫,০০০ টাকা করা হচ্ছে (সংরক্ষিত নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ৫,০০০ টাকা)।
আচরণবিধি সংশোধন : ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০২৬’ এবং ‘পৌরসভা নির্বাচন আচরণ বিধিমালা’র খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এতে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর কঠোর নির্দেশনা যুক্ত রয়েছে।
ভোটার ও কেন্দ্রের পরিসংখ্যান : ইসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারসংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, মোট ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৬০টি। সূত্র: নয়া দিগন্ত
