প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে নতুন মাইলফলক
নতুন প্রভাত ডেক্স
চীন ও বাংলাদেশ তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে আরও বাস্তবসম্মত সহযোগিতায় রূপান্তর করতে চাইছে, যেখানে এখন উদীয়মান শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সমন্বয়ের ওপর বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম সরকারি চীন সফরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত শুক্রবার দুই দেশই নতুন যুগে ‘উন্নততর অংশীদারিত্বের বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে’ সম্মত হয়, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।Politics
এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যগত ও উদীয়মান—উভয় খাতেই সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে সমন্বয় জোরদার করার যৌথ অঙ্গীকারকে পুনর্নিশ্চিত করে।
এই সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী রহমান উত্তর-পূর্ব চীনের ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’ (যা ‘সামার ডাভোস’ নামেও পরিচিত) এ যোগ দেন। সেখানে বিশ্বনেতা, নীতি-নির্ধারক এবং ব্যবসায়িক নির্বাহীরা উদ্ভাবন-ভিত্তিক উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে একত্রিত হন। এই ফোরামে তাঁর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ প্রচলিত খাতের বাইরে গিয়ে উদীয়মান শিল্প এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে চীনের সাথে সহযোগিতা বাড়াতে কতটা আগ্রহী।Demographics
গত শুক্রবার গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠককালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, চীন সর্বদাই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তন নির্বিশেষে চীন সব সময় বাংলাদেশের একজন “নির্ভরযোগ্য ভালো বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার” হয়ে থাকবে।
শি জিনপিং আরও জানান, চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি নতুন সরকারের দেশ পরিচালনার প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন করে।Executive Branch
প্রধানমন্ত্রী রহমান কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না (সিপিসি)-এর ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অভিনন্দন জানান। চীনকে একটি মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনের আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ সময় তিনি ‘এক চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র বিরোধিতাও করেন।
এই উন্নীত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছে মূলত বিগত কয়েক দশকের ক্রমাগত সম্প্রসারিত বাস্তব সহযোগিতার মাধ্যমে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ২৪.০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এ যোগ দেয়।Politics
গত এক দশকে চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী মেগা প্রজেক্টে অংশ নিয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। এই ধারাবাহিকতায়, শুক্রবারের বৈঠকটি পূর্ববর্তী অর্জনগুলোকে ধরে রেখে উদ্ভাবন-চালিত খাতগুলোতে পা রাখার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।Demographics
প্রেসিডেন্ট শি বলেন, চীন বাংলাদেশের সাথে উচ্চ-মানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এবং অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাতগুলোতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে প্রস্তুত। তিনি আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিএমবিইসি)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
শুক্রবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, চীন বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ চেইন এবং বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা জোরদার করতে, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং যৌথভাবে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা রক্ষায় কাজ করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশও দেশে বিনিয়োগকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার আশ্বাস দিয়েছে। উভয় পক্ষ মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ উন্নয়নসহ প্রধান প্রধান যোগাযোগ ও শিল্প প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছে।International Relations
এ ছাড়া শি জিনপিং গ্রিন ও লো-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এর মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার সম্ভাবনা খোঁজার আহ্বান জানান—যে বিষয়গুলো এবারের সামার ডাভোস বৈঠকেও মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।Executive Branch
এই কৌশলগত পরিবর্তনের বিষয়ে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ঝাং জিয়াডং মন্তব্য করেন যে, ঐতিহ্যগত ভারী অবকাঠামোর তুলনায় গ্রিন এনার্জি এবং ডিজিটাল অর্থনীতি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য একটি সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হতে পারে। তিনি বলেন, “এই খাতগুলোতে চীনের অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি এবং একটি শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। চীনের এআই মডেলগুলো ব্যবহার করলে তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে।”
পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বা কালচারাল এক্সচেঞ্জও নতুন গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। শি জিনপিং জানান, চীন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের বিনিময় বৃদ্ধিতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেন, বাংলাদেশ তার আধুনিকায়নের লক্ষ্য পূরণে চীনের সাথে অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি, প্রযুক্তি, গ্রিন এনার্জি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায়।বাংলাদেশ সংবাদ
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বাইরে, এই সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সমন্বয়কেও তুলে ধরেছে।
প্রেসিডেন্ট শি বলেন, একটি সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমুখী বিশ্ব এবং সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন নিশ্চিত করতে এবং গ্লোবাল সাউথ-এর (উন্নয়নশীল দেশগুলোর) সাধারণ স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করতে চীন প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ভিশন এবং প্রেসিডেন্ট শি-র প্রস্তাবিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ (গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ) বিশ্বশান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রাখছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে চীনের সাথে সমন্বয় বজায় রেখে কাজ করবে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয় ও জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখবে।
সূত্র: ইনকিলাব
