রাজশাহীতে বিএনপি নেতা ও স্বঘোষিত প্রেসক্লাবেরসেক্রেটারী মামুনের চাঁদা দাবির অডিও ভাইরাল
রাজশাহীর এক ব্যবসায়ীর কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী প্রেসক্লাবের স্বঘোষিত সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুনকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন, ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভাইরাল হওয়া অডিওতে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে গোলাম মোস্তফা মামুনের কথোপকথন শোনা যায়। ওই ব্যবসায়ী রাজশাহীতে মধু, ঘি ও আম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একজন পরিচিত উদ্যোক্তা বলে জানা গেছে।
অডিওর শুরুতেই মামুনকে বলতে শোনা যায়, “ওই বিষয়ে এখন কিছু বলব না, কাল তো ঈদ। ঈদ উপলক্ষে যদি কিছু দিতে চাও, দেও।” জবাবে ব্যবসায়ী বলেন, “এ উপলক্ষ ও উপলক্ষ নিয়ে বারবার আমি যাওয়া-আসা করতে পারব না। আপনার যেটা দাবি, বলেন। কালকে যেভাবে হোক একবারে দিয়ে দেব।” এরপর মামুন বলেন, বারবার যাওয়া-আসা করা লাগবে কেন, ঘরে বসেই তো দেওয়া যায়। কাল আগে ঈদটা করাও, পরে ওসব বিষয়ে কথা বলা যাবে।
কিন্তু ব্যবসায়ী বারবার নির্দিষ্ট অঙ্ক জানতে চাইলে কথোপকথন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী বলেন, ‘এসব কথা না ভাই, আপনি কত চাচ্ছেন একবারে বলেন।’ উত্তরে মামুন বলেন, ‘তোমার ওখানে এসে ভিজিট করব, তারপর বলব কত নেব।’
কথোপকথনের এক পর্যায়ে ব্যবসায়ী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমি শুধু আমের ব্যবসা করব ভাই। ঘি-মধুর ব্যবসা ছেড়ে দেব, এ জ্বালায় ও জ্বালায়। তখন মামুনকে বলতে শোনা যায়, ‘শুধু আমের ব্যবসা করলে তো আর আমাকে কিছু দেওয়া লাগছে না।’
এরপর ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঘি-মধুর ব্যবসা না করলেও তো চলা কষ্ট।’ জবাবে মামুন বলেন, ‘এই তো লাইনে আসছো।’ সবশেষে ব্যবসায়ী যখন বলেন, ‘ঝামেলা করতে পারব না ভাই, একবারে বলেন কত দেব,’ তখন মামুনের কণ্ঠে শোনা যায়, “কত দিবা? দুই লাখ দেও।
এই বক্তব্য ঘিরেই মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অনেকেই এটিকে সরাসরি চাঁদা দাবির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ অডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন। জানা গেছে, অডিওটি গত ঈদুল আজহার সময়কার একটি ফোনালাপের অংশ। সম্প্রতি সেটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট ওই ব্যবসায়ী দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরেই তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন আছে কি না, সে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বলেন, “ব্যবসা চালাতে হলে টাকা দিতে হবে বলে দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছিল। আমি এক লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও ঈদের শুভেচ্ছার কথা বলে আরও দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়।
অডিও ফাঁসের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভূমিকা ও ভাবমূর্তি নিয়ে। ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা, বাজারে অনিয়ম, ভেজাল, মূল্যবৃদ্ধি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার একটি সংগঠনের জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ ওঠায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
রাজশাহীর কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা বিভিন্নভাবে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। তবে একজন ভোক্তা অধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সামনে আসা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। রাজশাহীর এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, অডিওটির সত্যতা যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজিব বলেন, যে সংগঠন ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে, সেই সংগঠনের নেতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হবে। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। গোলাম মোস্তফা মামুন দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আসার চেষ্টা করছেন। ফলে তাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ দলটির ভেতরেও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা মামুন দাবি করেন, অডিওটি সম্পাদনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি তার (ব্যবসায়ীর) পারিবারিক একটি বিষয় নিয়ে কথোপকথন ছিল। অডিওটি কাটছাঁট করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব বিশ্বনাথ সরকার বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। তবে বিস্তারিত জানি না। অডিওটি আমার কাছে এখনও আসেনি। আমি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর চেষ্টা করেও ক্যাবের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভাইরাল হওয়া এই অডিও রাজশাহীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়ী অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সূত্র: অনলাইন
