আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শক্তি প্রয়োগ করবে পুলিশ

দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা অপরিস্থিতির চরম অবনতি ঠেকাতে এবার প্রয়োজনীয় শক্তি প্রযোগের কথা ভাবছে পুলিশ। এত দিন নমনীয় আচরণ করলেও জনগণের জানমালের হেফাজত ও পুলিশ সদস্যদের আত্মরক্ষায় বল প্রয়োগ করা হবে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এরইমধ্যে রাজধানীর আদাবরে পুলিশের গুলিতে দুই ছিনতাইকারীর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বলছে, প্রয়োজনীয় বল প্রয়োগ আইনের মধ্যেই রয়েছে। তবে বর্তমান পুলিশ সদস্যরা সেটি না করে নমনীয় আচরণের চেষ্টা করে যাচ্ছে। যাকে অপরাধীরা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ সবাই কলা গাছের সাথে পিঠ চুলকাতে মজা পায়; কিন্তু শিমুল গাছের ধারে কাছেও কেউ যায় না।

সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হলেও কোনো অবস্থায় তা স্বাভাবিক করতে পারছে না সরকার। একের পর এক খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, এমনকি পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এতে জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অপারেশন ডেবিল হান্ট থেকে শুরু করে বিশেষ অভিযানে অসংখ্য অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে দেশজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। তবে বরাবরের মতো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় গডফাদাররা। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বৃদ্ধির মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

জানা গেছে, রাজধানীর আদাবরে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তা চাপাতির আঘাতে জখম হয়েছেন। গত মঙ্গলবার আদাবরের ডেল্টা গার্মেন্টের পেছনে ছিনতাইকারীদের আস্তানায় পুলিশ অভিযান চালালে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি করলে দুই ছিনতাইকারী গুলিবদ্ধ হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আদাবরের ৭ নম্বর সড়কে বিকাশের দোকানিকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ও মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় কিশোর গ্যাং কবজি কাটা গ্রুপ। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। মোট ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক পরপরই, অর্থাৎ মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি ও মে মাসে ৩১০টি হত্যাকাণ্ডের কারণে ২০২৫ সালের তিন মাসে ৯৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের। ফলে তুলনামূলক প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল ৭৬৭। অন্য দিকে ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৭৯৪। চলতি বছর এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬টি, রাজশাহীতে ১০৬টি ও খুলনায় ৮৪টি। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে বরাবরের মতোই শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত) সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর ২৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সূত্রমতে দিন দুপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। গত শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ এক বাজারে ফিল্মি স্টাইলে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাতজন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে কেবল রাউজানেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮টি মৃত্যুই রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। যদিও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব নিহতের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করেনি। গত শুক্রবার খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া রোববার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন। একই দিন ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। সূত্র: নয়া দিগন্ত

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট