ওই দিনই মারা যান বৃদ্ধা নূর জাহান, পচন নয়-পিঠে ছিল ‘শয্যাক্ষত’
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের চরম অবহেলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এই নারী। মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন পর উদ্ধার করায় পচন ধরেছিল মরদেহে। নূরজাহান বেগমের সন্তানেরা তার ভরপোষণে অবহেলা করেছেন বলেও উঠেছে অভিযোগ। এ ঘটনার জের ধরে নূর জাহান বেগমের সন্তানদের বুধবার (৩ জুন) আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। অন্যদিকে তার ছেলে এবং মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য এ কে এম আনিসুর রহমানকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের ভবনটির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে গত ৩১ মে উদ্ধার করা হয় নূর জাহান বেগমের মরদেহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো কিছু দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, মরদেহে পোকার উপস্থিতিও দেখেছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিরা। স্থানীয়দের দাবির ভিত্তিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে মারা যান নূরজাহান বেগম। পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর খবর দেয়া হয় একজন নার্সকে। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে জানানোর পর উদ্ধার করা হয় মৃতদেহ।
তবে অনুসন্ধানে, এই মৃত্যু ঘিরে এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মরদেহের ময়না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো এক সময়ে নূর জাহানের মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন আগে মৃত্যুর কারণে শরীরে পচন ধরার দাবির কোনো সত্যতা নেই। পিঠে যে ক্ষত দেখা গেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় তার নাম ‘বেডসোর’ বা ‘শয্যাক্ষত’। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত দেখা যায়। দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে ফোসকা বা ক্ষতসহ পচনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
অনুসন্ধানে নূর জাহান বেগমের ঘরে নোংরা পরিবেশের বেশ কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছে। তবে সন্তানরা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন অথবা ভরণপোষণ দেননি- এমন অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। যে ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়, সেটি তার মেয়ের। জীবনের শেষ দুটি বছর তিনি মেয়ের সঙ্গেই থেকেছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ছিলেন দুই ছেলের কাছে। মারা যাওয়ার দুই দিন আগে ঈদের দিন ছোট ছেলে গিয়েছিলেন ওই ফ্ল্যাটে, কোরবানির মাংস খাইয়ে এসেছেন মাকে। সন্তানদের দাবি, মারা যাওয়ার দিনই (৩১ মে) তার মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এর পরদিন তাকে চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। নূর জাহান বেগমের বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত থেকে দাফন প্রক্রিয়া তদারক করেন। প্রয়াত এই নারীর বড় ছেলে যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, ছোট ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক।
আলোচিত ভবনটিতে বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভিতরের আরেকটি গেট তালা দেওয়া। কলিং বেল চাপলে নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে একজন নারী বেরিয়ে আসেন। প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তিন বছর তিনি নিচ তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। তবে চার তলার ফ্ল্যাটের নূর জাহান বা তার মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি।
ওই নারী বলেন, ‘তিনি (ফাতিমা) কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। বাসায় কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। চুপচাপ বাসা থেকে বের হতেন, চুপচাপ ঢুকতেন। মাথার চুল আউলা-ঝাউলা থাকতো বেশিরভাগ সময়। মাঝে মাঝে দেখতাম শুকনা খাবার নিয়ে আসতেন। তবে সবজি, মাছ, মাংস নিয়ে কখনো বাসায় ঢুকতে দেখিনি। এছাড়া গত তিন বছরে তার মাকেও কখনো দেখিনি। শুনেছি ঈদের দিন তার (মৃত বৃদ্ধা) নাতি খাবার দিয়ে গেছে। লাশ উদ্ধারের দিন পুলিশ আসার পর শুনলাম তিনি মারা গেছেন। তার আগে আমরা কিছুই জানতাম না।’
বাড়ির অন্যদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালে তিনি বলেন, ‘গেট খোলার ব্যাপারে বাড়িওয়ালার নিষেধ আছে। তাই ভেতরে ঢোকা যাবে না। এছাড়া এই দুপুরে ভবনে কোনো পুরুষ মানুষও নাই।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, ভবনটির মালিকানা নূর জাহান বেগমের মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার শ্বশুরপক্ষের। ফাতিমার স্বামী মারা যান ২০১৭ সালে। স্বামীর মালিকানা সূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটেই মাকে নিয়ে থাকতেন ফাতিমা। ওই ভবনে ভাড়া থাকা এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান ফাতিমার জীবন অগোছালো হয়ে পড়ে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে প্রায় দুই বছর আগে ভাইয়ের বাসা থেকে নিয়ে আসেন মাকে। তবে মা-মেয়ের জীবন এরপর আরো অগোছালো ও বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠতে শুরু করে।’
ফাতিমার ভাই বুয়েটের অধ্যাপক আশিকুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, তার দুলাভাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক। তারা মোট ছয় ভাইবোন ছিলেন। এর মধ্যে চার জন মারা গেছেন। আলোচিত ভবনটির নিজের ফ্ল্যাটে ফাতিমা একাই থাকতেন। নিঃসঙ্গতা কাটাতে ২০২৪ সালে বুয়েট শিক্ষক ভাইয়ের বাসা থেকে মাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। সূত্র: ইনকিলাব
