রাসূলুল্লাহ (সা.) কেন হজ্ব আদায়ে বিলম্ব করলেন?
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
হজ্ব ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মক্কার কুরাইশ বংশের, যারা বাইতুল্লাহ শরীফের মুতাওয়ল্লি হিসেবে সমগ্র আরবে বিশেষভাবে সম্মানিত ছিলো। হজ্বের মূল আনুষ্ঠানিকতা খানায়ে কাবা ও মক্কা কেন্দ্রীক। আল্ল্হার রাসূল হিজরত কালে খানায়ে কাবার দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর হৃদয়ে মাতৃভূমি ও কাবার প্রতি ভালোবাসা অমলিন ছিলো চিরকাল। হজ্ব ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিধানটি ফরজ হবার পরে তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার ও কাবা জিয়ারতের আকাঙ্খা পূরণের ঐশী পয়গাম এসে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি হজ্বের বিষয়ে আদেশ সূচক আয়াত নাযিল হবার পরে এক বছর বিলম্ব করে হজ্ব পালন করেছিলেন। ৯ম হিজরীতে হজ্ব ফরজ হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) সে বছর হজ্ব আদায় করেননি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে আমীরুল হাজ্ব করে ৩০০ জন সাহাবীর এক কাফেলাকে ওই বছর হজ্বে পাঠানো হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) কেন ৯ম হিজরীতে হজ্ব আদায় না করে এক বছর অপেক্ষার পরে ১০ম হিজরীতে হজ্ব আদায় করেন? প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রথমেই আমাদেরকে জানতে হবে, যে আয়াতের মাধ্যমে হজ্ব ফরজ করা হয়েছিল তাতে কি বলা হয়েছে? এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই সর্বপ্রথম যে ঘরটি মানুষের জন্য তৈরী করা হয়েছে, সেটা হলো ঐ ঘর যা মক্কাতে অবস্থিত, যা বরকতময় এবং সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জন্য হেদায়েত। তাতে রয়েছে মাকামে ইবরাহীমের মতো প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে লোক এর মধ্যে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর মানুষের মধ্যে যারা সেখান পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ রাখে তাদের উপর এ ঘরের হজ্ব আদায় করা আল্লাহর অধিকার। আর যে তা অস্বীকার করে! নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র জগৎ থেকে অভাবমুক্ত।”(সূরা আলে ইমরান: ৯৬-৯৭)
উদ্বৃত আয়াতের মধ্যে বিশেষ দুটি শব্দের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে আশাকরি। ১. হেদায়েতঃ কাবা শরীফকে মহান আল্লাহ সমগ্র পৃথিবীর জন্য হেদায়েত বলেছেন। যার অর্থ খানায়ে কাবা হলো সমগ্র পৃথিবীর হেদায়েতের কেন্দ্রবিন্দু। আর হেদায়েতের পথে সব থেকে বড় বাধা হলো শিরক আর মুশরিক জাতি। আর সে কারণেই মহান আল্লাহ পৃথিবীতে যতো নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন তাঁদের সকলের মিশন ছিলো, শিরক মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেমন এরশাদ হয়েছে,“তিনিই (আল্লাহ) প্রেরণ করেছেন তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ যেনো তিনি এদ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা তা পছন্দ করে না।”(সূরা আত-তাওবাহ: ৩৩) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষণ না তারা বলে ‘লা লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’। অতঃপর যে ব্যক্তি ‘লা লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে সে তার জীবন ও সম্পদ আমার থেকে নিরাপদ করে নিবে-তবে এর হক ব্যতীত। আর তার হিসাব আল্লাহর নিকট।”(সহীহ আল-বুখারী: ২৫, সহীহ মুসলিম: ৯৯) ২. নিরাপত্তাঃ উদ্বৃত আয়াতে মহান আল্লাহ কাবা ঘরকে মুসলমানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, “যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে।” হযরত ইবরাহীম (আ.) কাবাঘর নির্মাণের পরে মহান আল্লাহর দরবারে দোআ করেছিলেন,“হে আমার রব! এই স্থানকে নিরাপদ নগরী বানিয়ে দাও আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান আনবে তাদেরকে ফল-ফলাদি দিয়ে রিযিক দান করো! তিনি (আল্লাহ) বললেন, আর যারা কুফরি করবে তাদেরকেও আমি কিচুকাল ভোগ করতে দিবো; অতঃপর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে ধাবিত করবো-আর তা নিকৃষ্ট পরিণাম।”(সূরা আল-বাক্বরাহ: ১২৬) আর এই নিরাপত্তার পথে সব থেকে বড় বাধা ছিলো মুশরিক সম্প্রদায়। ৯ম হিজরীতে যখন হজ্ব ফরজ করা হয় তখন পর্যন্ত মক্কা ও কাবা শিরক ও মুশরিক মুক্ত ছিল না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা নগরী ও কাবা শরীফকে শিরক ও মুশরিক মুক্ত করে নিরাপত্তা নিস্তিত করার জন্য এক বছর অপেক্ষার পর ১০ম হিজরীতে হজ্ব আদায় করেন। ৯ম হিজরীতে হজ্ব ফরজ হলেও রাসূলুল্লাহ (সা.) সে বছর হজ্ব আদায় করেননি। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে আমীরুল হাজ্ব করে ৩০০ জন সাহাবীর এক কাফেলাকে ওই বছর হজ্বে পাঠানো হয় এবং মক্কা ও খানায়ে কাবাকে শিরক ও মুশরিক মুক্তির চুড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হয়। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে মুশরিকদেরকে বহিষ্কারের ঘোষণাপত্র পাঠ করার জন্য হযরত আলী (রা.)-কে পাঠানো হয়েছিলো। ঘোষণার বিষয়বস্তু সূরা তাওবাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে,“আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সেই সব মুশরিকদের প্রতি সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা, যাদের সাথে তোমরা চুক্তবদ্ধ হয়েছিলে। সুতরাং তোমরা (হে মুশরিকগণ) পৃথিবীতে চার মাস অবধি বিচরণ করো এবং জেনে রেখো, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না এবং আল্লাহ কাফিরদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। আর এটি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি বড় হজ্বের দিনে ঘোষণা, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল মুশরিকদের থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত। অতএব যদি তোমরা তওবা করো তবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রেখো-তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না। আর যারা কুফরি করে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।”(সূরা আত-তাওবাহ: ১-৩) লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
