রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে হবে
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে, এ বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা ও কোন্দলে ৫৯ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছে ৪৫ জন। এর অর্থ হচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলের আভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যতই দিন যাবে, এই অসহিষ্ণুতা যে আরো বৃদ্ধি পাবে, তা আন্দাজ করা যায়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটছে। আবার তারা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্বারা হামলা ও খুনের শিকার হচ্ছে। গত শুক্রবার রাজধানীর মাতুয়াইল ও কাফরুলে বিএনপি ও যুবদলের দুই নেতা সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হয়েছেন। মাতুয়াইলের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুদ্দিন খান ওরফে কালামকে সন্ত্রাসীরা দুপুর ১২ টার দিকে প্রকাশ্যে পিঠে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। তার পরিবার অভিযোগ করেছে, সন্ত্রাসী রাকিব হোসেন ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে কালামের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, রাকিবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর কিছুদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। অন্যদিকে, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকায় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে স্থানীয় যুবদলের কর্মী ইউসুফ বেপারী নিহত হয়েছে। এ সময় কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্রধারী এক হামলাকারীকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। স্থানীয় বিএনপির এক কর্মী জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাফিজুর রহমানসহ ৭ থেকে ৮ জন মিরপুর-১৩ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিল। এ সময় তিনজন অস্ত্রধারী এসে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে হাফিজুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন এবং ইউসুফের বুকে একটি গুলি লাগে। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ইউসুফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলিবিদ্ধ অপরজন হাফিজুর অন্য একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ ও হত্যাকা- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিই এমন যে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কুণ্ঠিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষমতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করা উচিৎ। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, আইনের চোখে সে অপরাধী। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হিসেবে বিবেচনা না করে তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর বিকল্প নেই। দলীয় কোন্দল বা বিভেদে যে সংঘাত-সংঘর্ষ ও খুন-জখমের ঘটনা ঘটে, তা নিরোধে ক্ষমতাসীন দলকেই দায়িত্ব নিতে হবে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দল থেকেই কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারি কিংবা অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে বিএনপি যেন অনেকটাই শৈথিল্য প্রদর্শন করছে। যেভাবে দলীয় নেতাকর্মী খুন হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। তারা নিরাপত্তার শঙ্কায় রয়েছে। অন্যদিকে, দলীয় খুনখারাবির বাইরেও সন্ত্রাসীদের দ্বারা মানুষ খুন হচ্ছে। সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিৎ, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অধিক সক্রিয় হওয়া। কোথায়, কোন এলাকায় সন্ত্রাসীরা সক্রিয়, তা পুলিশের অজানা নয়। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। যারা রাজনৈতিক হত্যাকা-সহ অন্যান্য হত্যাকা-ের সাথে জড়িত তাদেরকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনানুগ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে জনগণকে স্বস্তি দিতে হবে।
