এলডিসি উত্তরণ: প্রস্তুতির সময় কেন জরুরি

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক প্রামানিক

বাংলাদেশ ও নেপালের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বৈঠকে সদস্যরাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সুপারিশ অনুমোদন করে। এখন এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এটি শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার প্রতিফলন। তবে যেকোনো অর্জনের মতো এই উত্তরণের ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ কি সত্যিই উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?

জাতিসংঘের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশ মাথাপিছু জাতীয় আয় (এঘও), মানবসম্পদ সূচক (ঐঅও) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (ঊঠও)-এই তিন ক্ষেত্রেই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। কিন্তু পরিসংখ্যানগত যোগ্যতা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক প্রস্তুতি সব সময় এক বিষয় নয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ইজরাইল ও আমেরিকার ইরানের উপর আক্রমণ এবং ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকোচন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আগের তুলনায় আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেবল সময়ক্ষেপণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে বিশেষ সুবিধাগুলো ভোগ করেছে, উত্তরণের পর তার বড় অংশই বিলুপ্ত হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ঊইঅ) সুবিধার আওতায় বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে এসেছে। উত্তরণের পর এই সুবিধা হারালে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ এখনো তৈরি পোশাক খাত নির্ভর। ফলে অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে গেলে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান—উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই ঝুঁকি আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর অনেকেই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর এফটিএ বা সমজাতীয় চুক্তি সম্পাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। অথচ এমন চুক্তি সম্পাদন একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, যা বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগাই স্বাভাবিক। অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল তাই কেবল সুবিধাজনক নয়, অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

ওষুধ শিল্পের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবিদার। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল খাত দেশের অন্যতম সফল শিল্পখাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মূলত এলডিসি দেশগুলোর জন্য বিদ্যমান ট্রিপস (ঞজওচঝ) অব্যাহতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে। এই সুবিধার ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পেরেছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু উত্তরণের পর এই বিশেষ সুবিধা হারালে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পেটেন্ট-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নয়ন অর্থায়ন। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেয়ে এসেছে। উত্তরণের পর এই সুবিধা ধীরে ধীরে সীমিত হবে এবং বাণিজ্যিক শর্তে অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। রাজস্ব আহরণের বর্তমান সক্ষমতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় এটি একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। তবে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর যৌক্তিকতা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন সেই সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হবে। অতীতে যেমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিলম্বিত হয়েছে, এবার সেই সুযোগ থাকা চলবে না। বাড়তি সময়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঁচটি ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন।

প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এঝচ+ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাকের বাইরে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং জ্ঞানভিত্তিক সেবাখাতে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনা। তৃতীয়ত, ওষুধ শিল্পে কাঁচামাল উৎপাদন, গবেষণা ও পেটেন্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি। চতুর্থত, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। পঞ্চমত, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আরও কার্যকর পরিবেশ সৃষ্টি।

উন্নয়ন কেবল একটি মর্যাদার সনদ অর্জনের বিষয় নয়; বরং সেই অবস্থানকে টেকসইভাবে ধারণ করার সক্ষমতার নামই প্রকৃত উন্নয়ন। প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অযৌক্তিকভাবে উত্তরণ বিলম্বিত করাও কাম্য নয়। তাই প্রশ্নটি ‘কবে উত্তরণ হবে’-এতটা নয়; বরং ‘উত্তরণের পর বাংলাদেশ কতটা সক্ষম থাকবে’—সেটিই মূল বিবেচ্য। যদি অতিরিক্ত প্রস্তুতিকালকে কাঠামোগত সংস্কার, বাণিজ্য কূটনীতি, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে ২০২৯ সালে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। আর সেটিই হবে দেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও টেকসই পথ। লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। সধসঁহ.রপব.ৎঁ@মসধরষ.পড়স

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট