দারুল উলুম দেওবন্দ’ মূলনীতির উপর আজও অটল

মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ

ব্রিটিশদের শৈরশাসনের যাতাকলে পিষ্ঠ হয়ে যখন ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন, যখন ইসলামের স্বকীয়তা বিপন্ন প্রায়, মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত সন্ন্যাসি-ফকির আন্দোলন ১৭৬৩-১৮০০, তরিকত-ই মুহাম্মাদিয়া আন্দোলন ১৮২০, ফরায়েজি আন্দোলন ১৮১৮-১৮৫৭ ও সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭ সালে পর্যায়ক্রমে ব্যার্থ হবার পর মুসলিম ঐতিহ্য, কৃষ্টি এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র রক্ষার তাগিদে মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী (রহ.)-এর উদ্বোগে ও হাজী হুসাইন আহমাদ (রহ.), মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী (রহ.), মাওলানা জুলফিকার আলী (রহ.) ও মাওলানা ফজলুর রহমান উসমানী (রহ.)-এর সার্বিক সহযোগিতা ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনে ৩০ মে, ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৫ মহররম, ১২৮৩ হিজরিতে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে ডালিম গাছের নীচে যাত্রা শুরু করে দারুল উলুম দেওবন্দ। যা ছিল একাধারা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণআন্দোলন ও বিপ্লবের সূতিকাগার। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জন ও আর্থ সামাজিক পরিবর্তনে দারুল উলুম দেওবন্দের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে। যা উসূলে হাশতে গানা (আটটি মৌলিক নীতি) নামে পরিচিত। নিবন্ধের সূচনাতে আমরা উসূলে হাশতে গানা পর্যালোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

মূলনীতি ১: মাদরাসা পরিচালনার যাবতীয় ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য কোন বিশেষ ব্যক্তি, সরকার বা শাসকের উপর নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয়ে সাধারণ মুসলমানদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান বা চাঁদার মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সুতরাং মাদরাসার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীলদেরকে সবসময় বেশি বেশি অনুদান সংগ্রহে সচেষ্ট থাকতে হবে। নিজে চেষ্টা করার পাশাপাশি অন্যদেরকেও অনুদান সংগ্রহে উৎসাহিত করতে হবে। 

মূলনীতি ২: মাদরাসার হিতাকাঙ্খী ও শুভাকাঙ্খীদেরকে সবসময় ছাত্রদের খাবারের ব্যবসস্থা নিরবিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং ক্রমন্বয়ে খাবারের মান ও পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে।

মূলনীতি ৩: মাদরাসার উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতা সকলকে প্রতিষ্ঠানের উন্নতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোন বিষয়ে নিজের মতামত প্রষ্ঠিার জন্য একগুয়েমি করা যাবে না। বরং মুক্ত মনে ও সৎ উদ্দেশ্যে সবার মতামতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মূলনীতি ৪: মাদরাসার সখল শিক্ষককে সমমনা (একই আদর্শের) হতে হবে। নিজেকে অন্যেন তুলনায় বড় ভাবা, একে অন্যের সাথে অসম্মানজনক আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মূলনীতি ৫: নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম ও সিলেবাস অনুসরণ করতে হবে এবেং যথাসময়ে তা সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় মাদরাসার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। মূলনীতি ৬: মাদরাসায় সাধারণ মানুষের এককালীন অনুদান ও চাঁদা গ্রহন করা হবে, কিন্তু সরকার বা ধনী অভিজাতদের শর্তযুক্ত কোন অনুদান গ্রহন করা হবে না।

 মূলনীতি ৭: সাধারণ মানুষের দেয়া অনুদান বা চাঁদার অর্থ পরিপূর্ণ আমানাকদারি ও বিশ্বস্ততার সাথে মাদরাসার কাজে ব্যব্যয় করেতে হবে। কোন অবস্থাতেই খেয়ানাত করা যাবে না।

মূলনীতি ৮: মাদরাসার জন্য নির্ধারিত ও আদায়কৃত অর্থ যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে তা অন্য কোন দ্বিনী মাদরাসায় বা ইসলামিক কাজে খরচ করা যাবে।

দারুল উলুম দেওবন্দের পরিচালনা পরিষদ: দারুল উলুম দেওবন্দ পরিচালনার জন্য হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী (রাহ.) ও হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গোহী (রহ.)-এর চিন্তা ও আদর্শের ভিত্তিতে ১৩৬৮ হিজরি মোতাবেক ১৯৪৮ সালের শাবান মাসে একটি সংবিধান বা “দস্তর-ই-আসাসি” প্রণীত ও অনুমোদিত হয়। বস্তুত সাংবিধানিক ধারা মতে মাদরাসার যাবতীয় কার্যক্রম দুটি পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ক. মজলিসে শুরা বা সাধারণ পরিষদ খ. মজলিসে আমেলা বা নির্বাহী পরিষদ। মজলিসে শুরা বা সাধারণ পরিষদ বস্তুত এটি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পরিষদ বা পরামর্শ পরিষদ হিসেবে কাজ করে। মজলিসে সূরার সদস্য সংখ্যা ১৩-১৫ জন হয়ে থাকে। দস্তর-ই-আসাসি’র ধারা মতে বছরে অন্তত দু’বার এই পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাদরাসার মুহতামীম এ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে থাকেন আর সদরুল মুদাররিসীন সদস্য। পরিষদের অন্যান্য সদস্য সমগ্র ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের শ্রেষ্ঠ আলেমদের থেকে বাছাই করা হয়। কোন ভোটাভুটি বা নির্বাচনের মাধ্যমে নয় বরং শুরার বৈঠকে পরামর্শের মাধ্যমে পরিষদের প্রয়োজনীয় সদস্য আজীবনের জন্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়। মৃত্যু, শারীরিক অক্ষমতা বা কোন আদর্শিক কারণে কোন সদস্য বাদ গেলে তাঁর স্থানে অবশিষ্ট সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়। মজলিসে আমেলা বা নির্বাহী পরিষদ মূলত মাদরাসার দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনা করে থাকে।

১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ১৬৫ বছরে দারুল উলুম দেওবন্দকে অনেক কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। যাত্রার শুরুতেই ইংরেজ বিরোধী অবস্থানের কানণে বৃটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানসহ বহু আলেমকে মাল্টা দ্বীপে কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে ভারত-পাকিস্তানের আলিমদের মধ্যে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে, ভারত বিভাজনের পর সে দেশের মুসলমানদের মাঝে  টিকে থাকা ও তাদের আস্থা ধরে রাখা বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাাঁড়ায়। বিভিন্ন সময়ে ভরত সরকারের বৈরিতাও কম প্রতিকূলতার কারণ ছিল না। সার্বিক প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে আজও দারুল উলুম দেওবন্দ তার মূলনীতি ও আদের্শের উপর টিকে আছে নিজের স্বকীয়তাকে অক্ষুন্ন রেখে। আর তাইতো দারুল উলুম বেওবন্দ সমগ্র পৃথিবীর মুসলমানদের ইলমে দ্বীনের মারকাজ হিসেবে সমাদৃত। ভারতের সকল অঙ্গরাজ্য থেকে আগত শিক্ষার্থী ছাড়া পৃথিবীর ৬০ থেকে ৭০ টি দেশের শিক্ষার্থী এখনে ইলমে দ্বীন অর্জনের জন্য সমবেত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ৩০টি দেশে দারুল উলুম দেওবন্দের অনুকরণে অসংখ্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হেয়ছে। লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট