সম্পাদকীয়

শহীদ আবু সাঈদ স্মরণে

শহীদ আবু সাঈদ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বৈষম্য ও দুঃশাসন বিরোধী শিক্ষার্থীরা সারাদেশে প্রতিটি ক্যাম্পাসে একদিকে ছাত্রলীগ অন্যদিকে পুলিশের আগ্রাসী পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রথম সাহস সঞ্চয় করেছিল শহীদ আবু সাঈদের কাছ থেকে। চব্বিশের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীদের সামনে পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করছিল এবং রাইফেল তাক করে ভয় দেখাচ্ছিল। শহীদ আবু সাঈদ মাত্র বিশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। উপরের নির্দেশ ছিল যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমনের। আবু সাঈদের বুকে গুলি চালানোর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে ছাত্র সমাজ রাস্তায় নেমে আসে। ১৬ জুলাই আরো অন্তত ৫ জন শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে আবু সাঈদ হয়ে যান স্বৈরাচারী ঔদ্ধত্বের বিরুদ্ধে অসম সাহসের প্রতীক। একজন আবু সাঈদের জানবাজ মৃত্যু সারাদেশে লাখো আবু সাঈদের জন্ম দেয়। এরপর শহীদ ও আহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা যত বেড়েছে রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢল আরো প্রবল আকার ধারণ করেছে। মীরমুগ্ধ, ওয়াসিম, তাহির জামান, ফয়সাল এমন সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। ১৬ জুলাই থেকে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দিন থেকে ২০ দিনের রক্তাক্ত আন্দোলন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়, যা গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে। সে কারণেই শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু জাতির ইতিহাসের এক অত্যুজ্জ্বল মাইল ফলক হয়ে আছে। আবু সাঈদসহ জুলাই শহীদদের রাজপথে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনার আলোড়ন বাংলাদেশের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং রিপোর্টে সাড়ে চৌদ্দশ শহীদের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। যদিও জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনো অজ্ঞাত। পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা ও তালিকা প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের কার্যকর তৎপরতা এখনো অনুপস্থিত। যে জাতি গুণী ও বীরের প্রতি যথাযথ সম্মান দিতে জানে না, সে জাতির মধ্যে গুণী ও বীর জন্ম নেয় না। শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ নির্মম ফ্যাসিবাদী শাসনের কব্জায় থাকা জাতিকে মুক্তির জন্য উজ্জীবিত করেছিল। একাত্তরের লাখো শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতেই শহীদ আবু সাঈদসহ হাজারো তরুণ জাতির মুক্তির জন্য রাজপথে জীবন দেয়ার শপথ নিয়েছিল। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা দুঃশাসন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেলাম, সেই শহীদদের যথাযথ মর্যাদায় স্মরণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করার মধ্য দিয়েই কেবল ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। একাত্তর পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে জাতিকে বিভক্ত করলেও শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই নেয়নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়টিও পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নেও জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সরকার ও বিরোধীদল তথা বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক পক্ষের ঐক্য, সমঝোতা ও আন্তরিক প্রয়াস ছাড়া তা সম্ভব নয়। সামনের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে জাতি তার প্রতিফলন দেখতে চায়। শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই শহীদদের স্মৃতির প্রতি আমরা পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট