আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় নিহত আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ইরানকে নিশ্চিত করেছেন তেহরান তাদের সর্বোচ্চ নেতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং ৪০ দিনের গণশোক ঘোষণা করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন, যা বিপ্লবী গার্ডদের প্রতিশোধের আহ্বান জানিয়েছে। রবিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতার হত্যার পর ৪০ দিনের শোক এবং সাতটি সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন। "সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের সাথে সাথে, তার পথ এবং লক্ষ্য হারিয়ে যাবে না বা ভুলে যাবে না, অন্যদিকে, আরও জোর ও উদ্যমের সাথে সেগুলি অনুসরণ করা হবে," একজন উপস্থাপক বলেছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ডরা, এদিকে, খামেনির "খুনীদের" শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। "উম্মাহর ইমামের হত্যাকারীদের কঠোর, নির্ণায়ক এবং দুঃখজনক শাস্তির জন্য ইরানি জাতির প্রতিশোধের হাত তাদের ছাড়বে না," এক বিবৃতিতে গার্ডরা বলেছে। ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে যে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতার কন্যা, জামাতা এবং নাতনীও নিহত হয়েছেন। "সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের পর, বিপ্লবী নেতার কন্যা, জামাতা এবং নাতনী শহীদ হওয়ার খবর দুর্ভাগ্যবশত নিশ্চিত করা হয়েছে," ফার্স সংবাদ সংস্থা এবং অন্যান্য ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে খামেনির হত্যার পর ইরান ৪০ দিনের গণ শোক ঘোষণা করেছে।

মরেও অমর হলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় শহাদা বরণ করেন। বার্ত সংস্থা রয়টার্স এর দেয়া তথ্য থেকে জানা যায় খামেনি যখন নিজ কার্যালয়ে তাঁর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছিলেন ঠিক সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনী হামলা করে। হামলায় ইমাম খামেনি পরিবারের চার সদস্য মেয়ে, পুত্রবধু, জামাতা ও নাতি এবং ইরানের অন্তত ৪০ জন শীর্ষ স্থানীয় নেতা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হন। ইমাম খামেনি মারা যাওয়ার চার মাস পর সপ্তাহ ব্যাপি শেষকৃত্যানুষ্ঠান ও জানাজা শেষে গত ৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী জন্মস্থান ইরানে শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র শহর মাশহাদে ইমাম আলী রেজার মাজারে দাফন করা হয়। দীর্ঘ ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শাহাদাত বরণকারী ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মরেও অমর হলেন যা আজ পৃথিবীর সামনে দিবালোর মতো স্পষ্ট।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলে সপ্তাহকাল ব্যাপী। ৪ জুলাই তেহরান থেকে শুরু করে কোম, কারবালা হয়ে পরিশেষে খামেনির জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। ৪-৬ জুলাই ইমাম খামেনি ও তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের কফিন তেহরানের ইমাম খামেনি গ্রন্ড মোসাল্লায় রাখা হয় সর্ব সাধারণের প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। ৯০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি ও ইরানের সাধারণ জনগণ সেখানে ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ৭ জুলাই ইমামের কফিন তেহরান থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইরানের ধর্মীয় শহর কোমে স্থানান্তর করা হয়। ফাতেমেহ মাসুমেহ’ মাজারের উদ্দেশ্যে শোকযাত্রা বের হয় এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ৮ জুলাই কফিনটি প্রতিবেশি দেশ ইরাকে নেয়া হয় এবং কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজারে খামেনির জানাজ ও বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার ইমাম খামেনির কফিনটি  তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে নিয়ে আসা হয় এবং ইমাম আলী রেজার মাজারে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়। ইমাম খামেরি শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে পৃথিবীর ৭০টি দেশের সরকারি প্রতিনিধি দলসহ মোট ১০০টিরও বেশি দেশের ৫০০০ জন বিদেশি মানুষ অংশ গ্রহন করেন। আন্তর্জাতিক গণাধমের অনুমান সপ্তাহব্যাপী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ১ কোটি ২০ লাখের মতো লোক অংশ নিতে পারে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণামধ্যম দাবি করছে, মহান ইমামের জানাজা ও শেষকৃত্য অনষ্ঠানে ইরান ও ইরাক মিলেয়ে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। খামেনির জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠনে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ও তাদের অভিব্যক্তিই প্রমান করে যে, খামেনি মরেও অমর হয়েছেন।

বস্তুত ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের শুরু ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যদিও এর আগে ছিল তারা ঘনিষ্ট মিত্র। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ্িপ্লবের মাধ্যমে ইরানে শাহের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবীরা আমেরিকাকে শয়তানের শক্তি আখ্যায়িত করে। ওই বছরের নভেম্বর মাসে একদল ইরানি শিক্ষার্থী তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দলখ করে এবং ৫২ জন আমেরিকান কূটনীতিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি করে রাখে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের সাথে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তারপর থেকে বিগত চার দশকেরও বেশি সময়ে ইরানকে শায়েস্তা করতে আমেরিকা নির্বহী আদেশ ও কংগ্রেসের আইনের মাধ্যমে দেশটির বিভিন্ন ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নৌযানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১৮ সালে পারমানবিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একযোগে ৭০০-এরও বেশি নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল ও নতুন করে আরোপ করে, যা ছিল কোন নির্দিষ্ট সময়ে দেয়া ইরানের উপর সর্বোচ্চ চাপ। টহরঃবফ ঝঃধঃবং ংধহপঃরড়হং ংমংরহংঃ ওৎধহ ও মার্কিনট্রেজারি বিভাগের ওৎধহ ঝধহপঃরড়হং পোর্টাল থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

কিন্তু কোন কিছু দিয়েই ইরানকে দমানো যায়নি। বরং ইরান অতীতের চেয়ে আরো শক্তিশালী ও অদম্য হয়ে উঠেছে। এযাত মোসাদ ও সিআইএ এর গুপ্তহত্যা ও টার্গেট কিলিং এর শিকার হয়েছেন ইরানের শতাধীক পরমানু বিজ্ঞানি, উচ্চ পদস্ত সমরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আমেরিকা ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক ২৮ ফেব্রয়ারির হামলার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, একযোগে ইরানকে সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্ব শূণ্য করে ফেলা। তাদের বিশ্বাস ছিল, সেটা করা গেলে ইরানের জনগণ ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। আর সেই পথ ধরে ইরানে আমেরিকার অনুগত সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একাধিপত্বকে চিরস্থায়ী ও অপ্রতিদ্বন্দি করা সম্ভব হবে। কিন্তু তাদের সে “আশার গুড়ে বালি” প্রমানিত হয়েছে। ইরানি জনগণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি ঐক্যবদ্ধ, ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা ও সমর্থন দ্বিধা ও শঙ্কা মুক্ত। কোটি কোটি ইরানি জনগণ আমেরিকা ও ইসরাইলের ধ্বংস হোক’ শ্লোগানে প্রকম্পিত করে, ডোলান্ড ট্রাম্পের হত্যার দাবি সম্বলিত প্লাকার্ড বহন করে সর্বোচ্চ নেতার শোকর‌্যালি, জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠানে যোগদান করে প্রমান করেছে, খামেনি মরেও অমর হয়েছেন। আর ইরান ইতোমধ্যে তার উচ্চতর সামরিক সক্ষমতার প্রমান দিয়েছে। আমেরিকা চলমান যুদ্ধ থেকে আত্মসম্মান নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সকল পথ হারিয়ে এখন নতজানু হয়ে বাঁচার পথ খুঁজছে।   

লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ, কেন্দ্রীয় মসজিদ।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট