সম্পাদকীয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে

একদা ডেঙ্গুর মৌসুম বলতে বর্ষাকালকেই বুঝানো হতো। গত কয়েক বছরে এ ধারণা পাল্টে গেছে। এখন ডেঙ্গু সারাবছরের একটি রোগে পরিণত হয়েছে। এডিস মশার জীবনচক্রের পরিবর্তন, ডেঙ্গুসচেতনতার অভাব, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি এর কারণ। এবারের বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গুর বিস্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা জানান দিচ্ছে, রোগটি ভবিষ্যতে বিপর্যয়কর রূপ নিতে পারে, যদি না তার মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়। ইতোমধ্যে দেশের ৫৮টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়েছে। জুনের ২১ দিনে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার সাতশ’ তিনজন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। আক্রান্ত হয়েছে ২২০ জন। এ নিয়ে জানুয়ারি থেকে মৃত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ৯০০। এক সময় রাজধানী ঢাকাই ছিল ডেঙ্গুর সবচেয়ে উপদ্রুত এলাকা। এখন সারাদেশেই ডেঙ্গুর উপদ্রব লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে বরিশালে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় হারিয়ে যাওয়া হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এবার যেভাবে বাড়তে দেখা গিয়েছে, তা উদ্বেগ ও বিস্ময়Ñ দুইই জাগিয়েছে। হাম কোনো প্রাণঘাতী রোগ নয়; অথচ এতে এবার শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে। কোনো একটি মাত্র রোগে কয়েক মাসে এত শিশুর মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি। এখনো প্রতিদিন হামে দু’চার জন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। নতুন করে আক্রান্তও হচ্ছে অনেকে। শুরুতেই হামের টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় হযবরল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। টিকার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাম মোকাবিলায় ও চিকিৎসায় স্বাস্থ্য অধিদফতর শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এই ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। হাম, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ইত্যাদি রোগ থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে তিনি তার পদের দায়বদ্ধতা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে অনেকের অভিযোগ। তাদের মতে, ব্যর্থতা ও প্রশ্নবিদ্ধ কাজের দায়ে তাকে অবিলম্বে অধিদফতরের মহাপরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া দরকার। ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত রোগ। চিকুনগুনিয়াও তাই। এদের রোগলক্ষণ প্রায় একই রকম। যেহেতু এডিস মশার কারণে এদের বিস্তার ঘটে, সুতরাং এডিস মশা নির্মূল ও দমনে এ দু’রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। সাম্প্রতিক তথ্য মতে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকা বা ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭৫টির মধ্যে ৬৩ ওয়ার্ড এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনেরও বেশ কিছু ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে এবার ৬৪টি জেলাতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গোটা দেশই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে আছে বলা যায়। বলাই বাহুল্য, প্রতিবছর মশা নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে সিটি কর্পোরেশনসহ পৌরসভা ইত্যাদিতে অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এ বরাদ্দের একটি বড় অংশই লুটপাট হয়ে যায়। সাধারণত এসব কর্মসূচিতে মশার বংশ বিস্তার রোধ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসকে প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু এটা শতভাগ কার্যকর, তেমন দাবি করা যায় না। তাই এ নিয়ে আরো গবেষণা ও কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ নেয়া জরুরি। শুধু বিশেষ সময় না, সারাবছরই কীভাবে মশার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও বা প্রযোজ্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এখনই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগী ভর্তি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এইসঙ্গে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ডেঙ্গুসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট