লেবাননে নিষিদ্ধ সাদা ফসফরাসের ব্যবহার

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর ইরানে আঘাত হানার পর আজ তেরোটি দিন পার হয়ে গেছে। সময়ের স্রোতে ভেসে যেতে যেতে এখন যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এই যুদ্ধ এত সহজে শেষ হওয়ার নয়, যতক্ষণ না আক্রমণকারীরা নিজেরাই পিছু হটে। শুরুতে তাদের মনে হয়েছিল, এক ঝটকাতেই ইরানকে ভেঙে ফেলা যাবে; যেন দাবার বোর্ডে এক চালেই প্রতিপক্ষের রাজাকে কোণঠাসা করা যায়। তারপর সেখানে বসানো হবে তাদের অনুগত এক শক্তিকে। কিন্তু ইতিহাস প্রায়ই মানুষের অহংকারকে ব্যঙ্গ করে। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

ইরান যেন তার সমস্ত শক্তি, সমস্ত অবশিষ্ট জেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মরণপণ এক প্রতিরোধে। শুধু দাঁড়িয়ে থাকা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কৌশলও কম তীক্ষ্ণ নয়। ফলে এতদিনে যুদ্ধের যে চিত্র ভেসে উঠছে, তা মোটেই সহজ কোনো বিজয়ের গল্প নয়। বরং মনে হচ্ছে, এই আগুন ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আরও নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে—যেন মরুভূমির বাতাসে উড়ে যাওয়া অঙ্গার।

ইরানকে নতজানু করতে গিয়ে যৌথ বাহিনী যে নির্মমতার আশ্রয় নিয়েছে, তার বিবরণ শুনলে মানুষের বিবেক অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিধি, মানবাধিকার—এসব শব্দ যেন কাগজে লেখা কিছু বাক্য হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ঘটে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। ইরানের মিনাব শহরের শাজারা তায়েব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আকাশে হঠাৎ নেমে আসে এক ক্ষেপণাস্ত্র। মুহূর্তের মধ্যে স্কুলের উঠোন ভরে যায় ধোঁয়া আর আর্তনাদে।


সে হামলায় দেড় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়—তাদের অধিকাংশই ছিল ছোট ছোট ছাত্রী। প্রথমে অভিযোগ ওঠে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, কিন্তু কেউই দায় স্বীকার করেনি। পরে জানা যায়, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এই অস্ত্র মূলত আমেরিকার সামরিক ভাণ্ডারের পরিচিত নাম। পৃথিবীর আর কিছু দেশের হাতে থাকলেও ইসরায়েলের কাছে এটি নেই বলেই জানা যায়।


অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে—দক্ষিণ লেবাননের আবাসিক এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যাচাই করা কয়েকটি আলোকচিত্রে দেখা গেছে ৩ মার্চ ইয়োহমর অঞ্চলের বসতবাড়ির ওপর ফসফরাসযুক্ত গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা হয়েছে। সেই আগুনে অন্তত দুটি বাড়ি পুড়ে যায়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কের গন্ধ।


সাদা ফসফরাস এমন এক রাসায়নিক, যা বাতাসের অক্সিজেন ছুঁলেই জ্বলে ওঠে। তার আগুন ঘরবাড়ি, মাঠ, মানুষের জীবন—সবকিছুকে নির্বিকারভাবে গ্রাস করতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চোখে জনবহুল এলাকায় এমন অস্ত্র ব্যবহার করা অবৈধ, বর্বর এবং নির্বিচার আক্রমণের শামিল। এই হামলা এবং জোরপূর্বক এলাকা ছাড়ার নির্দেশের ফলে লেবাননে ইতোমধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক আক্রমণে সেখানে অন্তত ৩৯৪ জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।


ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। অথচ পৃথিবীর বিবেক যেন নীরব দর্শক হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যে প্রতিষ্ঠানকে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয় বলা হয়, সেই জাতিসংঘের ভূমিকাও এখানে খুব স্পষ্ট নয়। মনে হয়, শক্তিধর রাষ্ট্র চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে—মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধও যেন তাতে খুব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
কিন্তু পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এই যুদ্ধের খেলাকে থামতেই হবে। ধ্বংসের ভাষা দিয়ে কোনোদিন শান্তির ইতিহাস লেখা যায় না। লেবাননে ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগ এবং ইরানের একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া জরুরি। এই প্রশ্নের মুখ থেকে জাতিসংঘও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে না। মানবতার কাছে তাদেরও এক দায় আছে—এবং সেই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *