বেনজীর গ্রেফতার দেশে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে

সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেফতার দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত এই প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আধুনিক ‘ফেস রিকগনিশন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়। রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৩০০ বিধির বিবৃতির মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করার পর তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনায় আপাতত এটুকুই বলা যায় যে, সরকারের সদিচ্ছা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থার কার্যকর সমন্বয় থাকলে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা অসম্ভব নয়। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বক্তব্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বলতে হয়-দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়াই চূড়ান্ত কিছু নয়, এটি জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। সাবেক এই আইজিপির দম্ভ পুরোপুরি চূর্ণ হয়েছে বা সুশাসন শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আসল পরীক্ষাটি শুরু হবে তাকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও আইনি চ্যানেল ব্যবহার করে দেশে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার মধ্য দিয়ে। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি ও আদালতের নানা কাঠামোগত ধাপ পার করে একজন অপরাধীকে অন্য দেশ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এখন তৎপরতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করতে হবে, যেন প্রত্যর্পণ আবেদনে কোনো ধরনের ফাঁকফোকর না থাকে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ৫টি মামলায় প্রায় ৭৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তদন্ত চলছে। এছাড়া আদালতের আদেশে তার ও তার পরিবারের শত শত বিঘা জমি, গুলশান ও বাড্ডার ফ্ল্যাট, বিপুল অঙ্কের ব্যাংক হিসাব এবং করপোরেট শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগে ২০২১ সালে তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এসেছিল।

আমরা মনে করি, বেনজীর আহমেদের এই পরিণতি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আমলাতন্ত্র এবং ক্ষমতাশীলদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অপরাধের রাজত্ব কায়েম করে, জনগণের সম্পদ লুট করে কিংবা ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে পৃথিবীর কোথাও যে চিরস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া যায় না, এ ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হলে এই প্রক্রিয়াকে শুধু একটি বিশেষ উদাহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা ক্ষমতার অবস্থান নির্বিশেষে সব দুর্নীতিবাজকে আইনের মুখোমুখি করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হবে। সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে-এটাই প্রত্যাশা।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট