সম্পাদকীয়

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ভারত

ভারতের আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী নীতির কারণে বাংলাদেশে বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। একদিকে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও সশস্ত্রকরণে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগসুত্রের অভিযোগ কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল করে রাখার এটি একটি ভারতীয় নীল নকশার অংশ। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হওয়ার গলাবাজি প্রায়শ শোনা যেতো। তবে সেই সম্পর্কের লেনদেন ছিল একপাক্ষিক। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন, তা চিরদিন মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের কাছে না চাইতেই ভারত দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত অনেক কিছুই পেয়ে গেলেও বাংলাদেশ তার অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যাও পায়নি। পানি আগ্রাসন, সীমান্তে আগ্রাসন ও গুলি করে বাংলাদেশি হত্যা, চোরাচালান, একপাক্ষিক বাণিজ্য এবং পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের তৎপরতা ও আত্মগোপণের নিরবিচ্ছন্ন আশ্রয় নিশ্চিত রেখেছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে অনেক বড় কৌশলগত ঝুঁকি সত্ত্বেও ভারতের সেভেন সিস্টার্সের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতাদের ধরে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও অখন্ডতা নিশ্চিত রাখতে সহায়তা করেছে হাসিনা প্রশাসন। বিনিময়ে ভারতে আশ্রিত পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো একজন সন্ত্রাসীকেও বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি ভারত। উপরন্তু বিএসএফ’র গুলিতে প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকরা নিহত হয়েছে। নিরপরাধ কিশোরী ফেলানিকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুঁলিয়ে রাখলেও তার কোনো বিচার ও ক্ষতিপুরণ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। এটাই হচ্ছে, ভারতের সাথে শেখ হাসিনার একপাক্ষিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার নমুনা। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ বিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য ও তৎপরতা বেড়েছে। নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে বিতর্কিত এসআইআর বা নাগরিকত্ব বাছাই আইন করে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল। সে সব মানুষকে এখন বাংলাদেশি ট্যাগ লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশ করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে বিএসএফ। অবৈধ অভিবাসি শনাক্তকরণ ও নিজদেশে প্রত্যার্পণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও রীতিনীতি রয়েছে। সে সবের তোয়াক্কা না করে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলমানদের জবরদস্তি রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে সীমান্তে রোহিঙ্গা সংকটের মত আরেকটি মানবিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে ভারতীয় প্রশাসন। বিজিবি’র কঠোর অবস্থান, তীক্ষè নজরদারি এবং স্থানীয় জনতার সাহসী প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ’র পুশ-ইন প্রয়াস কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও এটা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ় ও স্বচ্ছ অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। নতুন বাংলাদেশের অবস্থান ও নেতৃত্বের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.খলিলুর রহমান আশাবাদ জাগালেও সরকারের কতিপয় মন্ত্রী-এমপিকে এখনো ভারত তোষণে ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। উস্কানি বা হুমকি দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ও আস্থা অর্জন করা সম্ভব না হলেও দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে কারো নমনীয়তা ও আপসকামীতা কাম্য নয়। পার্বত্য সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দান, বিতর্কিত আইন তৈরী করে ভারতীয় নাগনিকদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করার মত ঘটনাগুলোর যৌক্তিক, মানবিক ও আইনসম্মত সমাধান হওয়া জরুরি। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে কাজ না হলে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে হবে। সেই সাথে সীমান্ত নিরাপত্তাসহ যে কোনো হুমকি মোকাবেলায় বিজিবি, সেনাবাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। বঙ্গোপসাগরে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল ও প্রযুক্তিগত সার্ভেইলেন্স বাড়ানোর জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। পার্বত্য সীমান্তে গোয়েন্দা ড্রোন ও হেলিকপ্টারের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বিজিবি’র সাথে স্থানীয় জনতার সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ জোরদার করতে হবে। পাহাড়ি সন্ত্রাসিদের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধে জিরো টলারেন্স র্নীতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। ভারতে পলাতক পেশাদার খুনি, অপরাধি ও পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করতে সরকারকে দ্বিপাক্ষিক সংলাপ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট