বালা-মুসিবত কেন আসে?

মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ

জীবন মানেই যন্ত্রণা। পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যার জীবন নিরবিচ্ছিন্নভাবে শান্তিতে পরিপূর্ণ। বরং প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু অশান্তি হরহামেশা লেগেই থাকে। তবে জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিকে ধৈর্য্যরে সাথে মোকাবেলা করতে যারা সক্ষম, তারাই স্বার্থক। হতাশা কেবল জীবনের যন্ত্রণাকেই বৃদ্ধি করে। বিপরিত দিকে ধৈর্য্য মানুষকে কাঙ্খিত সাফল্যের বন্দরে পৌঁছে দেয়। তাইতো মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন,“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন।”(সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৩) শারীরিক ও আর্থিক বিপর্জয়, পারিবারিক ও সামাজিক বিবাদ, শত্রু সংঘের অত্যাচার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঈত্যাদি অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলিকে আমরা বালা-মুসিবত হিসেবে জানি। আবার এগুলি থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য অনেকেই মহান বিধাতা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। বক্ষমান নিবন্ধে আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে বালা-মুসিবত কেন আসে এবং তা থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। ১.কর্মফল: মানুষ জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছু ভোগ করে সবই তার কর্মের ফল। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “প্রতেকটা মানুষের সামনে এবং পেছনে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী নিয়োজিত রয়েছে, যারা তাঁর নির্দেশে তাদেরকে হেফাযত করে। আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোন জাতিকে বিপদগ্রস্ত করতে চান, তখন তা রদ করার নয়। আর তিনি ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।”(সূরা আর-রা’দ: ১১) আলোচ্য আয়াত দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, মানুষ যখন ভালো কাজ তথা নেক আমল করে, তখন তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যানকর পরিণতি নির্ধারিত হয়, আর যখন খারাপ কাজ তথা পাপাচার করে, তখন পরিণতি অনাকাঙ্খিত ও কষ্টদায়ক হয়। ২. পরীক্ষা: কখনো কখনো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পিবদাপদ-বালা-মুসিবত দিয়ে মুমিন বান্দার ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। যেমন এরশাদ হয়েছে,“এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে শুভসংবাদ দাও সবরকারীদেরকে।”(সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৫৫) ৩. পাপ মোচোন: কখনো কখনো মহান আল্লাহ মুমিন বান্দার উপর বাল-মুসিবত চাঁপিয়ে দিয়ে তার গুনাহ মাফ করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি সহীহ হাদীস থেকে জানা যায়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) ও হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা উভয়ে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“কোন মুসলমান ব্যক্তির উপর যে কোন কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্টদায়ক বিষয় বা দুঃখবোধ: আপতিত হয়-এমনকি তার গায়ে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।”(সহীহ আল-বোখারী: ৫৬৪১, সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩) ৪. মর্যাদা বৃদ্ধি: আবার অনেক সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুমিন বান্দাকে দুনিয়াতে বালা-মুসিবতে আক্রান্ত করে তার মর্যাদা বৃব্ধি করেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে একটি হাদীস বর্ণীত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“মহান আল্লাহ যখন তাঁর কোন বান্দার কল্যান চান, তখন তিনি তার গুনাহের শাস্তি দুনিয়াতেই তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন। আর যখন আল্লাহ কোন বান্দার অকল্যান চান তখন তিনি তাকে তার গুনাহের কারণে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান না করে অবকাশ দেন, যেনো কিয়ামতের দিন সে তা পুরোপুরি ভোগ করতে পারে।”(জামে আত-তিরমিযী: ২৩৯৬) ৫. সমাজের নেতৃস্থানীয়রা যখন পাপাচারে নিমজ্জিত হয়: একটা সমাজের সকল মানুষ একসাথে পাপাচার করতে পারে না। তবে মহান আল্লাহর বিধান হলো, যখন কোন সমাজের নেতৃস্থানীয়রা পাপাচারে নিমজ্জিত হয়ে যায়, তখন তিনি ওই সমাজের উপর ব্যাপকভাবে আসমানী আযাব নাযিল করেন। যেমন এরশাদ হয়েছে,“ যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তার নেতৃস্থানীয়দেরকে (সৎকাজের) আদেশ করি; কিন্তু তারা সেখানে অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হয়। তখন সে জনগোষ্ঠির উপর শাস্তির বিধান অবধারিত হয়ে যায়, অতঃপর আমি সেটিকে ধ্বংস করে দিই।”(সূরা আল-ইসরা: ১৬)

আমরা যদি আমাদের সমাজের নেতৃস্থানীয়দের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো তারা প্রায় সকলেই আপাদমস্তক পাপাচারে নিমজ্জিত। সকল শ্রেণি ও পেশার চিত্র একই। কিন্তু এই মানুষগুলো ভিন্ন কোন গ্রহ থেকে নেমে এসে আমাদের ঘাড়ে চেঁপে বসেনি বা হটাৎ করেই দুর্নীতিবাজ ও পাপাচারী হয়ে ওঠেনি। বরং সামাজিক অবক্ষয়ের ক্রমাবনতি আমাদের সমাজকে বিরাজমান করুণ পরিনতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আর এর দায় সমাজের সাধারণ মানুষও এড়াতে পারে না। সুতরাং পরিতর্বনের সূচনাটা হতে সমাজের তৃণ্যমূল পর্যায় থেকে। প্রত্যেকটা ঘরকে গড়ে তুলতে হবে নিতী-নৈতিকতা, খোদনুগত্য ও পাপাচার মুক্তির আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে। যেনো কোন মায়ের একটি সন্তানও নীতিহীন-পাপাচারী হয়ে বেড়ে উঠতে না পারে। আর অতি অবশ্যই পাপাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামজিক প্রেিরাধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে অবশ্যই সমাজ থেকে দুর্নীতি বিদায় নিবে এবং ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক, পাপাচার মুক্ত সমাজ ব্যাবস্থা গড়ে উঠবে, যা আমাদেরকে আসমানী বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করতে পারে। লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসনজিদ।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট