স্থানীয় নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছে না আ.লীগ
জাতীয় সংসদের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে। কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ দলগুলোর নেতাকর্মীরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, সেজন্য নির্বাচন আচরণ বিধিমালাগুলোতে নতুন বিধি যুক্তের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। প্রস্তাবিত ওই বিধি হচ্ছে, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই-এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অঙ্গীকারনামায় সঠিক তথ্য না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইসির। এর ফলে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ রয়েছে।
ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ইসির খসড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের প্রচারে অংশ নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র সংজ্ঞায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে মন্ত্রী, এমপি ও সিটি করপোরেশনের মেয়রদের পাশাপাশি তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারবেন না। সম্প্রতি এসব বিধিমালার খসড়া তৈরি করেছেন ইসির কর্মকর্তারা। ঈদের ছুটি শুরুর আগে শেষ কর্মদিবস ২৪ মে রোববার ওই খসড়ার কপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চার কমিশনারকে দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এই খসড়া নিয়ে আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনাররা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ইউনিয়ন পরিষদের আচরণ বিধিমালার খসড়া ‘অনেকটা মডেল’ হিসাবে কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বিধিমালায় যেসব সংশোধনী আনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একমত হবে, সেই সংশোধনীগুলো সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনের ধরন অনুযায়ী আচরণ বিধিমালায় যতটা সম্ভব সংযোজন বা বিয়োজন করা হবে। তারা আরও জানান, নির্বাচন কমিশনের আইন সংস্কার কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিচালনা বিধিমালা এবং আচরণ বিধিমালার সংশোধনী নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকের পর এসব খসড়া তৈরি করা হয়। ওইসব খসড়া সংশোধনীর ওপর নির্বাচন কমিশনাররা মতামত দিলে এতে আবারও সংশোধনী আসতে পারে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়ার বিধান রাখব ইনশাআল্লাহ। এটা আমাদের রাখতে হবে। আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে এ বিধি যুক্ত হচ্ছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো দল বা সংগঠনকে সামনে রেখে এটা করা হচ্ছে না। বাংলাদেশে কয়েকটা দল নিষিদ্ধ আছে। দেশে বিদ্যমান অন্যান্য আইন বিবেচনায় নিয়ে এটা করা হচ্ছে। কোনো দলকে টার্গেট করে নয়।
আরও জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজন করতে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর সংশোধনী পাশ হয়েছে। ওই আইন অনুযায়ী, আচরণ বিধিমালা ও পরিচালনা বিধিমালা থেকে রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট অংশগুলো বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ইসির কর্মকর্তারা। এই সংশোধনী আনতে গিয়ে আচরণ বিধিমালার কয়েকটি বিধি-উপবিধি থেকে ‘রাজনৈতিক দল’ শব্দ বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের চাঁদা বা অনুদান দিলে অথবা রাজনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচনি এলাকায় সভা-সমাবেশ করলে তা আটকানোর ক্ষমতা হারাবে ইসি। এমনকি আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করলে রাজনৈতিক দলের যে দণ্ডের বিধান রয়েছে, তাও বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে কাগজের পোস্টারে প্রচার এবং ব্যানার ও ফেস্টুনসহ নির্বাচনি সামগ্রীতে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার চালানোর বিধানসহ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে।
নির্বাচনের সময়ে রাজনৈতিক দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার প্রস্তাবিত বিধান ইসির জন্য আত্মঘাতী হওয়ার আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও পরোক্ষভাবে তাতে দলীয় প্রভাব থাকবেই। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দল বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে অন্য দলগুলো তাদের তৎপরতা বাড়াবে। এ বিষয়ে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী যুগান্তরকে বলেন, অতীতে অনেক নির্বাচনে দেখা গেছে, নির্দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে অনেক রাজনৈতিক দল প্রার্থী মনোনয়ন না দিয়ে সমর্থন দিয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা প্রার্থীকে জিতিয়ে আনতে কাজ করেছে। নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে এই প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। সামনের নির্বাচনগুলোতে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না, এমনটি বলা যায় না। ইসি যদি দলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়, তাহলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ইসি সচিবালয় খসড়া সংশোধনী তৈরি করেছে। সেখানে যেসব সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে, ঈদের ছুটি থাকায় সেগুলো নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। আমরা সব বিষয়ে আলোচনা করব। এরপর সিদ্ধান্ত নেব। সূত্র: মানব জমিন
