সম্পাদকীয়

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে এআই প্রযুক্তি নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে

ট্রাফিকবিধি না মানা আমাদের দেশের চালকদের একটা ‘সাধারণ অভ্যাসে’ পরিণত হয়েছে। হরহামেশা ট্রাফিকবিধি লংঘনের ফলে সড়কের শৃংখলা যেমন বিনষ্ট হয়, তেমনি যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ে। সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনার এটা সবচেয়ে বড় কারণ। ট্রাফিকবিধি লংঘন করে যানবহান চালানোর ফলে সড়ক-মহাসড়কে প্রায়শই যানজটের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট সড়ক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহনব্যবস্থাপনার শোচনাীয় ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। ট্রাফিকসিগন্যাল ব্যবস্থা চালু আছে শহর ও অন্যত্র। তবে কোথাও কোথাও পুলিশ এখনো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করে যানবাহন। হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কগুলোতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও শৃংখলাবিধানে নিয়োজিত আছে। তারপরও স্বীকার করতে হবে, আমাদের দেশে সড়কশৃঙ্খলা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং যানবাহননিয়ন্ত্রণ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসায় অপারগ। বিরাজমান এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন হয়েছে। গত ৭ মে ট্রাফিকনিয়ন্ত্রণে এআই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। ট্রাফিকসিগন্যালের সাথে এআই ক্যামেরা যুক্ত হয়েছে। এ ক্যামেরা চোখ রাখছে সিগন্যালে ও সড়কে। কোথাও ট্রাফিকবিধি লঙ্ঘিত হলে তার তথ্য ও চিত্র সংরক্ষণ করছে। এআই ক্যামেরা লাল বাতি লংঘন, উল্টো পথে যাত্রা, স্টপলাইন অতিক্রম, অবৈধ পার্কিং, মোটর সাইকেলে হেলমেট ব্যবহার না করা, গাড়ি চালানোর সময় সিটবেল্ট না বাঁধা, চলন্ত যানবাহনে মোবাইল ফোনে কথা বলা ইত্যাদি ধরনের ট্রাফিকবিধি লংঘনের তথ্য শনাক্ত ও সংগ্রহ করছে। সংরক্ষিত থাকছে এসবের ভিডিও ও স্থির চিত্র। ক্যামেরায় ধারণ করা এসব ভিডিও ও স্থির চিত্রের ভিত্তিতে ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফ্টওয়ারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি হচ্ছে। মামলার কাগজপত্র তৈরি হলে দায়ী গাড়ির নাম্বার প্লেট বিশ্লেষণ করে বিআরটিএর ডেটাবক্স থেকে তার মালিকের নাম ও স্থায়ী ঠিকানা সংগ্রহ করে তার বা চালকের মোবাইলে এসএমএস পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এছাড়া অপরাধের বিবরণ ও জরিমানার অংক জানিয়ে মালিকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রথম দুই সপ্তাহে এই সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রাথমিক নজরদারিতেই তিন হাজারের বেশি গাড়ির ট্রাফিকবিধি লংঘনের তথ্য ও চিত্র সংগৃহীত হয়েছে। সত্যতা শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পর চারশ’ থেকে পাঁচশ’ মামলার নোটিশ প্রদান শুরু হয়েছে।  ট্রাফিকনিয়ন্ত্রণে এআই প্রযুক্তি ধারণার চেয়েও অধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে। রাজধানীর সড়কে শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় এ প্রযুক্তির বিকল্প নেই। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও আরামপ্রদ করার জন্যই তো। কাজেই, যেখানে যে প্রযুক্তির উদ্ভাবন হোক, তা সংগ্রহ করা অগ্রাধিকার দাবি করে। অবশ্য প্রযুক্তি সংগ্রহই যথেষ্ট হতে পারে না, যদি না তার ব্যবহার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। ইনকিলাবের খবরে বলা হয়েছে, নতুন প্রযুক্তি সংযোজনের ফলে ট্রাফিকনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। চালকরা এখন লাল বাতি অমান্য করার প্রবণতা থেকে সরে আসছে। অন্যান্য বিধি লংঘনের ক্ষেত্রেও তারা সতর্ক। মামলার ভয় তাদের এই সতর্ক হওয়ার মূলে কাজ করছে। আইনের ত্বরিৎ যথাযথ প্রয়োগ প্রত্যাশিত সুফল দিতে দেরী করে না। এ বাস্তবতা তারই প্রমাণ। ‘কেউ দেখছে না, তাই অমান্য করা যায়’, কিংবা ‘অমান্য করলে কী হবে’ এ ধরনের মনোভাব এতদিন চালকদের মধ্যে কাজ করেছে। দীর্ঘদিনে তাদের এ মাইন্ডসেট তৈরি হয়েছে। এখন তাদের এ মনোভাব পরিবর্তনের সময় এসেছে। আইন মান্য করার বাধ্যবাধকতা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। তবে চালকদের কেউ কেউ এবং মালিকদের একাংশ এ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। তারা বিরক্ত এবং এই বিরক্তির কারণ অজানা নয়। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, তাদেরও শুভবুদ্ধির উদয় হবে। জানা গেছে, রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করতে আগামী ছয় মাসে ৬০টি ও এক বছরে ১২০টি ট্রাফিক পয়েন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদে পাঁচশটি রোড জংশনকে এ প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে। আশা করা যায়, তখন আর ট্রাফিকবিধি লংঘনের ঘনঘটা থাকবে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু রাজধানী শহর নয়, দেশের সব শহর, সড়ক-মহাসড়ক ও সড়ক-জংশনকে এআই ক্যামেরার নজরদারির আওতায় আনা হলে ট্রাফিকব্যবস্থা সহজ মসৃণ ও অধিকতর কার্যকর অবস্থায় উপনীত হবে। মানুষের চলাচল, মালামাল পরিবহন নির্বাধ ও দুর্ভোগমুক্ত হবে।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট