সম্পাদকীয়

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ : একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক নদী-আইন অনুসারে ভাটির দেশের সাথে আলোচনা, সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়া যৌথ নদীতে বাঁধ নির্মাণের সুযোগ না থাকলেও পদ্মার উজানে ফারাক্কায় গঙ্গা নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৪ সালে ভারত অনেকটা প্রতারণামূলকভাবে চালু করে বাংলাদেশের পানিসম্পদ ও প্রাণ-প্রকৃতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ষাটের দশকে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু হওয়ার পর থেকেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পাল্টা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করেছিল। ১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানী প্রথম ফারাক্কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ, জনমত গঠন ও ফারাক্কা লং মার্চ আয়োজন করে বিশ্বের কাছে ফারাক্কার বিপদ সম্পর্কে বার্তা দিয়েছিলেন। গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গার পানিচুক্তি বাস্তবায়ন এবং পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ সরকারের সম্ভাব্য বিকল্প। অন্তত তিনবার সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও ১৯৯৬ সালে একটি নাম-কা ওয়াস্তে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মূলা ঝুলিয়ে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। যদিও চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ কখনোই পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি। ভারতের বশংবদ শেখ হাসিনা সরকার গঙ্গা-তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ন্যূনতম দাবি তুলতেও ব্যর্থ হয়েছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগানকে সামনে রেখে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এবার দীর্ঘ ৬ দশকের স্বাপ্নিক পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের তিনমাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ পদ্মা ব্যারাজ প্রাথমিক মূল কাঠামো নির্মাণ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদন দিয়েছেন। এই প্রকল্পের সামগ্রিক সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর থেকে ২০৩১ ও ৩৪ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের নির্মাণ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এটি নির্মিত হলে এর রির্জাভারে অন্তত ২৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুকিয়ে যাওয়া নদনদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে এবং ধানের উৎপাদন কমপক্ষে ২৪ লাখ টন বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে। সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিকল্পনা গ্রহণের পরও পদ্মা ব্যারাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে ধরা হয় ভারতের আপত্তি এবং সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। জুলাই অভ্যুত্থানে বশংবদ সরকার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশের মাটি ও মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে বিশেষত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আপসহীন দৃঢ়তা জাতিকে নতুনভাবে আশান্বিত ও উজ্জীবিত করে তুলেছে। ১৯৬০ এর দশকে গৃহিত ও বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বিগত সরকারের আমলে দ্বিগুণের বেশি খরচে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও এর সম্ভাব্য পরিসমাপ্তি নিয়ে অনেক আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ জ্বালানি লোডিংয়ের পর্ব শেষ করে এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে কিছুটা গাত্রদাহ দেখা দিয়েছে। তারা ভারতের পানি আগ্রাসনের বিপক্ষে নিরবতা অবলম্বন করলেও গঙ্গা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিতে চাইছে। দিল্লির কাছে মাথা বেচে দেয়া পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ আন্দোলনের সাথে জড়িত কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতা করার সাহস না পেলেও প্রকারান্তরে সংশয় সৃষ্টি করতে চাইছে। একনেকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাদের প্রতিক্রিয়ায় এমন আভাস পাওয়া গেছে। যৌথ নদীর উপর ভারতের একতরফা বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের প্রকল্প অবৈধ। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে ভাটিতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ সম্পূর্ণই বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যারা ভারতের সাথে আলোচনার প্রশ্ন তুলছেন, তাদের অভিসন্ধি বা মনোভাব সহজেই অনুমেয়। তবে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি যথার্থই বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনার কিছু নেই। দেশের মানুষের প্রয়োজনে বাংলাদেশ তার অবস্থান ও সামর্থ্য অনুসারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। এটাই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বাংলাদেশের নীতি। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ অনুমোদনসহ সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অকুণ্ঠ অভিনন্দন ও ধন্যবাদ।
 

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট