সম্পাদকীয়

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও তারেক রহমানের সংকল্প

হাজার বছর ধরে তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রাণপ্রবাহ। উজানে ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে অববাহিকা অঞ্চলে তিস্তা এখন মৃত প্রায়। উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহার ও বাঁধ নির্মাণে বাংলাদেশে বিরূপ প্রভাবের চিত্র নতুন করে বলার কিছু নেই। এ অঞ্চলের কৃষি, নৌ যোগাযোগ, জীব-বৈচিত্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তা ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়লেও তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের তালবাহানার শিকার বাংলাদেশ। গত দেড়যুগ ধরে ভারতের বশংবদ সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন থাকলেও তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির মূলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। কংগ্রেসের মনমোহন সিং থেকে বিজেপির নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে তারা বিশ্বস্ত সহযোগি হিসেবে গণ্য করলেও বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনে তিস্তা চুক্তি ঝুঁলিয়ে রাখার মূল কৌশল ছিল পশ্চিমবঙ্গে মমতা বেনার্জির বিরোধিতার অজুহাত। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বেনার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির মধ্য দিয়ে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির ক্ষেত্রে কথিত মমতা কার্ড আর নেই। অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগও অনেকদূর এগিয়েছে। বিশেষত চীনের বিনিয়োগ, কারিগরী ও অর্থনৈতিক সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য এক নতুন স্বাপ্নিক প্রকল্পে পরিনত হয়েছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার হিসেবে আলোচিত হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা চেয়েছেন। সেই সাথে তিনি চীনের রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ(বিআরআই) ও রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ইস্যুতেও দুই পক্ষের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে চীনের সিপিপিসিসি বা গণরাজনৈতিক পরামর্শক সম্মেলনের চেয়ারম্যানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের সাথে চীনের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ ও উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা আরো বাড়িয়ে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করার দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশিত হয়েছে। আঞ্চলিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগতও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় আসীন হতে চলেছে। নিকটতম প্রতিবেশি হিসেবে ভারত যেমন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একইভাবে উন্নয়ন অংশীদারিত্বে চীনের সহযোগিতা আমাদের জন্য অপরিহার্য। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট জিয়ারউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া তথা বিএনপির উত্তরাধিকার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অঙ্গীকারাবদ্ধ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাণিজ্য, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রসমুহ পর্যালোচনা ও এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নেরই অংশ। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রসমূহ নির্ধারণ করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দক্ষ কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তার চীনা প্রতিপক্ষের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের দৃঢ়তা ও প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরার মাধ্যমে চীনের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন, এটাই ছিল জাতির প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে তিনি অনেকটাই সফল। অনেক আগেই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। পূর্বমূখী পররাষ্ট্রনীতি ও কানেক্টিভিটি উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাথে চীনসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ উন্মুক্ত হবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে এই মুহূর্তে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার কার্যকর উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চীনের সাথে গভীরতর সহযোগিতার এক মাইল ফলক অগ্রগতি অর্জিত হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতার নিশ্চিত করতে চীন সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও ঐকান্তিক প্রয়াসকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট