সম্পাদকীয়

পারিবারিক চিকিৎসা ব্যয় দেশে দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে

প্রত্যেক নাগরিকের ফ্রি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউডিএইচআর (ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস) বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের শোষণায়ও প্রত্যেক মানুষের মানসম্মত স্বাস্যসেবা নিশ্চিত করার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এসব কনভেনশনে স্বাক্ষরদাতা বা সভ্য হিসেবে বাংলাদেশের সরকারকেও নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে এসেও আমরা নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারিনি। এটা রাষ্ট্রের জন্য অনেক বড় ব্যর্থতা। সরকারের শীর্ষস্থানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মীনি ডা. জোবাইদা রহমান যখন দেশের বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ ও অনুধাবন করে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিষয়টিকে স্বীকার করে এর থেকে উত্তরণে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা বলেন, তখন বাস্তবিক অর্থেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করে। ডা. জোবাইদা রহমান রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় কড়াইল বস্তি এলাকাসহ দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একটি বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তি এলাকার ৪২.৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান খোঁজেন স্থানীয় ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানে। অর্থাৎ ডাক্তারের কাছে গিয়ে ডায়াগনোসিস ও যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করার সামর্থ্য তাদের নেই। তিনি আরো জানিয়েছেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের শতকরা ৭২ শতাংশ রোগীর পরিবারকে বহন করতে হয়। আর এই চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। একে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির এটি অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ডা. জোবাইদা রহমান। উন্নত দেশের সাথে তুলনীয় না হলেও ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছে। জনস্বাস্থ্য তথা সাধারণ মানুষের সুস্থতা জাতির অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য অনুসঙ্গ। একদিকে কোটি কোটি মানুষের অসুস্থতা জাতির উৎপাদনশীলতার অন্যতম অন্তরায়, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে বিদেশে যেতে হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে, সেই সাথে মেডিকেল ট্যুরের নামে দেশ থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাবেক মার্কিন ডিফেন্স সেক্রেটারি অস্টিন লয়েড আফ্রিকার দেশগুলোতে বিদ্যমান পেন্ডেমিক বা অতিমারীকে একবিংশ শতকে সম্মুখ সারির নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দৈন্যদশা দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। এর থেকে উত্তরণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন উদ্যোগ তেমন কোনো কাজে আসবে না। গতকাল পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের বর্ধিত ভবনটি গত বছর ডিসেম্বরের ৮ তারিখে উদ্বোধন হলেও শুধুমাত্র জনবল নিয়োগ এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় এ থেকে মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না। অথচ, রোগীর প্রচুর চাপ থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন শত শত জরুরি রোগী চিকিৎসার জন্য সিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের পর ৪৪১ জন ডাক্তার নিয়োগের কথা থাকলেও মাত্র ৩১ জন ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেখানে ৫৫৯ জন নার্সসহ সুপারভাইজার নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৮৫ জন নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের অবস্থা থেকে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সরকার হাসপাতালের অপ্রতুল সিট ও চিকিৎসা সেবার কারণে সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা সেবা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ প্রতারিত, নিঃস্ব ও জীবনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। বিগত করোনা ভাইরাস মহামারী এবং বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবে আইসিইউ সংকট ও চিকিৎসা বঞ্চিত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা থেকে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কারে নতুন সিদ্ধান্তে আসতে হবে। জিডিপি ও জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ অন্তত দ্বিগুণ বাড়াতে হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট