ফিরাউনের ঔদ্ধত্য ও তার পরিণতি     

মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ

মানুষ যখন তার ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকে চিরস্থায়ী মনে করে, তখন তার মধ্যে অহংকার জন্ম নিতে জন্ম নিতে শুরু করে। আর সেই অহংকার যদি তাকে সত্য অস্বীকার ও মানুষের উপর জুলুমের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে তার পতন শুধুমাত্র সময়ের অপক্ষো। মহান আল্লহ পবিত্র কুরআনে ক্ষমতার দম্ভে দিশেহারা জালিম শাসক ফিরাউনের লাঞ্ছনাকর পরিণতি তুলে ধরেছেন—যে ক্ষমতার দম্ভে নিজেকে সর্বোচ্চ মনে করেছিলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

মিসরের শাসক ফিরাউন, বনি ইসরাঈলকে দাস বানিয়ে রেখেছিলো এবং সে তাদের উপর নির্মম নীপিড়ন চালাতো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন,“নিশ্চয়ই ফিরাউন দেশে ঔদ্ধত্য করেছিলো এবং তার অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রেখেছিলো। তাদের একদলকে সে দুর্বল করে রেখেছিলো; তাদের পুত্র সন্তানদেরকে হত্যা করতো এবং কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখতো।”(সূরা আল-কাসাস: ৪) আলোচ্য আয়াতে শাসকের অন্যায়ের পাশাপাশি ক্ষমতা ধরে রাখতে মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিভক্তি সৃষ্টি ও ভয়-ভীতি ছড়ানোর কুটকৌশলও প্রকাশ করা হয়েছে। 

মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)-কে ফিরাউনের কাছে পঠিয়েছিলেন। তিনি ফিরাউনকে এক আল্লাহর ইবাদাতের আহবান জানান এবং বনি ইসরাঈলকে মুক্তি দিতে বলেন। কিন্তু ফিরাউন সত্য গ্রহন না করে নিজের ক্ষমতার বড়াই করে বলেছিলো,“আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ প্রতিপালক।”(সূরা আন-নাযিআত: ২৪) এটি ছিলো সীমালঙ্ঘনের চুড়ান্ত প্রকাশ: একজন মানুষ নিজের কর্তৃত্বকে এমনভাবে তুলে ধরলো যে, যেনো তার উপর কোনো বিচারক বা রব নেই। মুসা (আ.)-এর স্পষ্ট নিদর্শন দেখেও ফিরাউন ও তার অনুসারীরা অস্বীকারে অটল থাকে। তারা মুসা (আ.)-কে মিথ্যাবাদী বলে এবং তাঁর অনুসারীদের উপর নির্যাতন চালায়। তবুও মুসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বনি ইসরাঈলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। ফিরাউন সেনাবাহিনী নিয়ে তাঁদের পিছু ধাওয়া করে। সামনে সমুদ্র আর পিছনে শত্রুসৈন্য—এমন সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহর আদেশে মসুদ্রের মধ্যে পথ তৈরি হয়ে যায়। হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা নিরাপদে পার হয়ে যান; কিন্তু ফিরাউন ও তার বাহিনী সমুদ্রে ডুবে যায়। পবিত্র কুরআন ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছে,“ফিরাউন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলো; অতঃপর সমুদ্র তাদের এমনভাবে আচ্ছন্ন করলো, যা করার ছিলো।”(সূরা ত্ব-হা: ৭৮) মৃত্যুর আগে ডুবে যাওয়ার সময়ে ফিরাউন বলেছিলো, সে বনি ইসরাঈল যে উপাস্যের উপর বিশ্বাস করেছে সে তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে। কিন্তু তখন শাস্তি প্রত্যক্ষ করে বলা সেই কথা আর আল্লাহর দরবারে গ্রহনযোগ্য হয়নি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,“এখন? অথচ এর আগে তুমি অবাধ্যতা করেছিলে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে।”(সূরা ইউনুস: ৯১) এরপর আল্লাহ ঘোষণা করেন,“আজ আমি তোমার দেহকে রক্ষা করবো, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো।”(সূরা ইউনুস: ৯২) আয়াতটির শিক্ষা হলো—দুনিয়ার ক্ষমতা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সিদ্ধান্ত ঠেকাতে পারে না; ফিরাউনের পরিণতি মানুষকে তার সীমা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফিরাউনের শেষ পরিণতির সময়ের অবস্থা বর্ণনায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসে বলা হয়েছে,“ফিরাউন ডোবার সময় হযরত জিবরাইল (আ.) তার মুখে কাদা দিতে থাকেন, এই আশঙ্কায় যে সে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে ফেলবে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।” ইমাম তিরমিযী (রহ.) হাদীসটিকে “হাসান, সহীহ, গরীব” বলেছেন। (জামে আত-তিরমিযী: ৩১০৮) আলোচ্য হাদীস শেষ মুহূর্তের ঈমান ও তওবার বিষয়টি ভাবায়; আর কুরআনের আয়াত জানিয়ে দেয়, ফিরাউনের স্বাকারোক্তি এসেছিলো শাস্তি এসে যাওয়ার পরে।

ফিরাউনের লাঞ্ছনাজনক পরিণতি থেকে আরো একটি শিক্ষা হলো, জুলুমের শিকার মানুষকে দুর্বল ভেবে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ দুর্বল বনি ইসরাঈলকে মুক্তি দিয়েছেন এবং তাদের অত্যাচারী শাসককে ধ্বংস করে দিয়েছেন। ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ও সম্পদ কারো জন্য স্থায়ী নয়, এগুলো পার্থিব জীবনের সাময়িক জৌলুস মাত্র; এগুলো ন্যাবিচার ও জবাবদেহি এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র—যে কেউই অহংকার কারে সত্যকে অস্বীকার করলে এবং মানুষের অধিকার হরণ করলে ফিরাউনের পরিণতি তার জন্য সতর্কবার্তা। লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট