যৌথ অভিযানের বিকল্প নেই

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আগামী বছরের জানুয়ারি মাসেই শুরু হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। সরকার পরিচালনায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন বিএনপিপন্থিদের স্থানীয় সরকারে আসা যখন খুবই গুরুত্বপুর্ণ; তখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে সারাদেশে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি-দখলদারিত্ব। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে চলছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব। অপরাধীদের তা-বে ভেঙে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ফুটপাত থেকে শুরু করে শপিংমল, কাঁচাবাজার থেকে মাছবাজার, লেগুনা ও সিএনজি স্ট্যান্ড, অটোরিকশার গ্যারেজ, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, এমনকি শিল্প কারখানা— সবখানেই চলছে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব। এতে করে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভাবমর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। আবার ‘ঘর পোড়া আগুনে আলু পোড়া খাওয়ার’ মতো জামায়াত- এনসিপি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বিএনপিকে গণবিচ্ছিন্ন করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। এসব অপরাধকা-ের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নাম থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতার করতে বা অপরাধ ঠেকাতে সাহস পাচ্ছেন না। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ অভিযানের বিকল্প নেই। আর এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে না এলে তা কার্যকর হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ পরিচালনা করা হয়েছিল। কিন্তু সাবেক প্রধান উপদেষ্টার আন্তরিকতার অভাবে সেটা তেমন সফলতা পায়নি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সরকারের সময়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সফল হয়েছিলেন। জনগণের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকায় ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ এ চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে জড়িত বিএনপির বিপুল সংখ্যক স্থানীয় নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। রাজনৈতিক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপির ইমেজ রক্ষা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের ভোট পেতে চাইলে দ্রুতই অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা করা উচিত। শেখ মুজিবুর রহমান চোরাচালান এবং অপরাধ দমনে ১৯৭৪ সালের ২৪ এপ্রিল সেনাবাহিনীকে অভিযানে নামিয়ে যেমন দলের অভিযুক্তদের গ্রেফতারের মাধ্যমে চোরাচালান ঠেকিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর উচিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অভিযান পরিচালনা করে দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের পাকড়াও করা। তা না হলে চাঁদাবাজি-দখলবাজির জাল যেভাবে সারাদেশে বিস্তৃতি ঘটেছে এবং জামায়াত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ‘বিএনপিকে চাঁদাবাজ’ ট্যাগ মিশনে নেমেছে সময় পেরিয়ে গেলে দলের ভাবমর্যাদা ধরে রাখা যাবে না। তবে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পুলিশ বাহিনী যেভাবে কাজ করছে, তারা তাদের অ্যাক্টিভিটি আরো বাড়াচ্ছে। তবে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে।

গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুরে ৫০ বছরের পুরনো অত্যন্ত সুপরিচিত বেসরকারি দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র ‘রাড্ডা’ কার্যালয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় সন্ত্রাসীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এক্সকেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় অসচ্ছল মা ও শিশুদের জন্য চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। তিন ঘণ্টাব্যাপী তা-ব চলাকালে পুলিশ ছিল চরম নিষ্ক্রিয় ও নীরব দর্শক। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং বিএনপির একজন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পায়নি। এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। গতকালও নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, পাকিস্তান আমলেও হাসপাতালে এমন তা-বের ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতালে তা-বের রেশ কাটতে না কাটতে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় ঘটে আরেক ঘটনা। দেশের আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের (শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের ভাগ্নি জামাতা) স্টুডিওতে চালানো হয় হামলা ও ভাঙচুর। জমি সংস্ক্রান্ত বিষয়ে এ ভাঙচুর হলেও ঘটনার পরপরই সালমান মুক্তাদির ফেসবুক ভিডিওতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি খোলাখুলিভাবে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাদের চাঁদাবাজ বলে অভিযুক্ত করেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সালমান মুক্তাদিরের এ বক্তব্যকে ঢালাও অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেন। পরে অবশ্য সালমান মুক্তাদির জানান, তার কাছে কেউ চাঁদা চায়নি। এছাড়া রাজধানীর আদাবরে বাড়ি ও মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টার ঘটনাও সামনে এসেছে। সেখানেও দখল করা জমি দীর্ঘদিন পর উদ্ধারের ঘটনা দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু একের পর এক ঘটনাকে পুঁজি করে ‘বিএনপি চাঁদাবাজ’ সোশ্যাল মিডিয়ায় জামায়াতি ট্যাগে সরকারের ভূমিকা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একই আলোচনার ঝড় উঠছে— অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় বা ওপর মহলের ইন্ধন পাচ্ছে বলে এভাবে বেপরোয়া হয়ে ওঠার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করছে সরকার। নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু চাঁদাবাজির সঙ্গে যে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ উঠে এসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক তালিকায়। সূত্র: ইনকিলাব

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট