লাইসেন্স-নম্বরপ্লেট ছাড়াই দাপট, অটোরিকশার চাপে অসহায় রাজশাহী মহানগরী

স্টাফ রিপোর্টার

একসময় পরিচ্ছন্ন, প্রশস্ত সড়ক, নির্মল বাতাস আর শান্ত পরিবেশের শহর হিসেবে রাজশাহীর আলাদা পরিচিতি ছিল। শিক্ষা নগরী হিসেবে দেশের মানুষের কাছে স্বস্তিদায়ক নগরজীবনের উদাহরণ হয়ে উঠেছিল শহরটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অলিগলি—প্রায় সর্বত্রই বেড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার উপস্থিতি। এর মধ্যে লাইসেন্স ও নম্বরপ্লেটবিহীন যানবাহনের পাশাপাশি নম্বরপ্লেট টেম্পারিং করা অটোরিকশা চলাচলের অভিযোগও রয়েছে। ফলে যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯টি এবং অটোরিকশা ৮ হাজার ৯৭০টি। দুই শ্রেণির নিবন্ধিত যানবাহন মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৭৮৯টি। তবে নগরীর বিভিন্ন সড়কে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকার পরও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন যানবাহন সড়কে যুক্ত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহী নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে যত্রতত্র অটোরিকশা চলাচল করছে। পাড়া-মহল্লার সরু সড়ক থেকে শুরু করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক—সবখানেই অবাধে চলছে এসব যান। সিটি করপোরেশন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি চলাচলের সময় নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে সেই নিয়ম কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে চলাচল করছে।

নগরীর জিরো পয়েন্ট, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, রেলগেট, তালাইমারি, কোর্ট স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে দিনের বড় একটি সময় যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য নির্ধারিত স্থান ব্যবহার না করে অনেক অটোরিকশা সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। কেউ হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে থেমে যাচ্ছে, আবার কেউ যাত্রী তোলার জন্য একাধিক যান পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে রাখছে। এর সঙ্গে উল্টো পথে চলাচল ও যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

ট্রাফিক আইনকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই লাইসেন্স ও নম্বরপ্লেটবিহীন অটোরিকশা নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ নগরবাসীর। ফলে বৈধ যানবাহন শনাক্তকরণ এবং অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

অটোরিকশা নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগের আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে ভাড়া। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়া, যাত্রীদের সঙ্গে দর-কষাকষি এবং স্বল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহনে অনীহার অভিযোগ রয়েছে কিছু চালকের বিরুদ্ধে। ফলে যানজট ও দুর্ঘটনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনতে হলে এসব বিষয়ও একই সঙ্গে নজরদারির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

নগরীর ব্যস্ততম সড়ক সাহেববাজারে কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী সুজন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, অনেক বছর ধরেই রাজশাহীতে রিকশা দেখছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। রিকশা ও অটোরিকশার কারণে এখন অনেক সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর অভিযোগ, অনেক চালক তীব্র গতিতে গাড়ি চালান এবং ট্রাফিক আইন মানেন না। পুলিশকে বিভিন্ন মোড়ে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে দেখা গেলেও অটোরিকশার বিরুদ্ধে আরও নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

রাজশাহী রেলগেট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে নগরীতে অটোরিকশা ছিল, কিন্তু সংখ্যা ছিল নিয়ন্ত্রিত। স্বল্প দূরত্বে মানুষের যাতায়াতের জন্য এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এখন কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সেই সুবিধাই অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, অটোরিকশা বন্ধ নয়, বরং এগুলোকে নিয়মের মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

শুধু চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা নয়, নগরীতে নতুন অটোরিকশা যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরীতে অটোরিকশা তৈরির ছোট-বড় কারখানা রয়েছে অন্তত ৫০টি। এসব কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০০টি নতুন রিকশা তৈরি হয়ে নগরীর পরিবহন বহরে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সিটি করপোরেশন বলছে, নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকার পরও এসব নতুন যান কীভাবে নগরীর সড়কে যুক্ত হচ্ছে?

অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে সময়ের অপচয়ও বাড়ছে। নগরীর যেসব সড়ক দিয়ে কয়েক মিনিটে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যেত, সেখানে এখন অনেক সময় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের প্রতিদিনই এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যানজটের কারণে শুধু সময় নয়, জ্বালানি ও কর্মঘণ্টারও অপচয় হচ্ছে।

হাবিব নামের এক পথচারী বলেন, আগে যে পথ পাঁচ মিনিটে যাওয়া যেত, এখন অনেক সময় আধা ঘণ্টাও লেগে যায়। যানজটের কারণে অফিসের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিবারের সদস্যদের আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজেও অটোরিকশাজনিত যানজটের প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি।

নগরীর শিরোইল এলাকার অটোরিকশাচালক মেহেদী হাসান বলেন, আমরাও চাই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি করা হোক। রাজশাহীতে এখন অনেক যানবাহন বেড়ে গেছে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরাও গাড়ি চালায়। যাদের গাড়ির লাইসেন্স এবং চালকের সক্ষমতা রয়েছে, তাদেরকে রেখে যাদের গাড়ির লাইসেন্স নেই, তাদের গাড়ি জব্দ করে আইনের আওতায় আনা হোক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বপ্নীল রহমান বলেন, রাজশাহীর যানজটকে শুধু অটোরিকশার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান টেকসই হবে না। নগরীর মোট যানবাহনের সংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা, রুট ব্যবস্থাপনা, পার্কিং সুবিধা, যাত্রী ওঠানামার নির্ধারিত স্থান, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগ—সবকিছু সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে অটোরিকশা তৈরি ও নগরীতে নতুন যানবাহন যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

যত্রতত্র যানবাহন বেড়ে যাওয়ায় নগরীর যানজটের সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুতগতিতে চলাচল, রাস্তার মাঝখানে থেমে যাওয়া, যাত্রী ওঠানো-নামানোর সময় পেছনের যানবাহনকে চলাচলের সুযোগ না দেওয়া এবং উল্টো পথে চলাচলের কারণে প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে মৃত্যুর মতো দুর্ঘটনাও ঘটছে।

রাজশাহী জেলা পুলিশ ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১৬৯টি মামলা হয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা সংশ্লিষ্ট। এছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে।

এদিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, লাইসেন্স ও কাগজপত্রবিহীন অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবৈধ অটোরিকশা শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চালকদের ডেকে সচেতন করা হচ্ছে। লাইসেন্স ছাড়া রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় গাড়ি না চালানোর বিষয়ে চালকদের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকাও নেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, বৈধ কিংবা অবৈধ—অটোরিকশাগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অটোরিকশার সংখ্যা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এবং বিদ্যমান যানবাহনকে কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মহানগরের আয়তন ও যানবাহন—দুটিই বেড়েছে। তাই এলাকাভিত্তিক একাধিক ডাম্পিং স্টেশন করা গেলে অভিযান আরও কার্যকর হবে। অন্তত একটি স্থায়ী, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত জায়গার ডাম্পিং স্টেশন এখন জরুরি। এতে জব্দ করা যানবাহন নিরাপদে রাখা এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতাও বাড়বে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কেবল অভিযান পরিচালনা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। নগরীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অটোরিকশার বিকল্প নিয়েও ভাবতে হবে। একই সঙ্গে এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগকে আরও পেশাদার ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া অটোরিকশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল বলেন, নম্বরপ্লেট বা নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে অটোরিকশাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে এক ধরনের অটোরিকশা এবং অন্য সময়ে অন্য ধরনের অটোরিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করা গেলে সড়কে একসঙ্গে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব। সময়ভিত্তিক ও রুটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে নগরবাসীর জন্য তা কার্যকর হবে বলেও মনে করেন তিনি।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাজ চলছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, অটোরিকশার অনেকগুলোরই রেজিস্ট্রেশন বা চেসিস নম্বর না থাকায় মামলা করা কঠিন। তবে স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন থাকলে অবৈধ অটোরিকশা আটক করে সেখানে রাখা সম্ভব হবে। এতে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা কমার পাশাপাশি নগরের যানজট ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণে সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট