হিংসার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ
মোহাম্মাদ মাকছুদ উল্লাহ
কারো ভালো কিছু দেখলে অন্তর জ্বালায় ভুগতে থাকা, তার বিণাশ বা ধ্বংস কামনা করাকেই বলে হিংসা। হিংসা মানব চরিত্রের সব থেকে নিকৃষ্ট স্বভাব। হিংসা হিংসুককে কুরে কুরে খায়, সে সব সময় অন্তর জ্বালায় দ্বগ্ধ হতে থাকে, মানসিক যন্ত্রণায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে, অন্যের সাথে শত্রুতায় লিপ্ত হয়, তার ক্ষতি সাধনে মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট, সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। হিংসুক মানুষ তার যোগ্যতা যাই হোক, সে সব সময় অবচেতন মনে কামনা করে, পৃথিবীর যাবতীয় কল্যান কেবল তারই হোক। অর্থ-বৃত্ত, পদ-পদবি, প্রভাব-প্রতিপত্তি সবকিছু তার একারই হোক। আর এ চাহিদা পূরণে সে ন্যায়-অন্যায়ের বাছ-বিচার করে না। তার কামনার পথে যাকেই সে বাধা মনে করে, তাকে সরিয়ে ওই স্থানটা দখল করতে প্রয়োজনে হত্যাকান্ডের মতো জঘণ্য পথকে বেছে। আর এ-ভাবেই সমজটা পরিণত হয় জলন্ত অগ্নিকুন্ডে। হিংসা শুধু সামাজিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং হিংসুকের জীবনের সুখ-শান্তি কেড়ে নিয়ে তার জীবনকে সাক্ষাৎ নরকে পরিণত করে আর পরকালে জাহান্নামের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিকে অপরিহার্য করে তোলে।
মানব চরিত্রের এই নিকৃষ্ট স্বভাব হিংসাকে নিয়েই মানুষের পৃথিবীতে আগমন। পৃথিবীর প্রথম মানব পরিবার হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর ঔরসে জোড়ায়-জোড়ায় (পুত্র ও কন্যা) সন্তানের জন্ম হতো। তখন মহার আল্লাহর বিধান ছিলো জমজ ভাই-বোন পরস্পর বিবাহ করতে পারবে না। এক জোড়ার ভাই অপর জোড়ার বোনের সাথে বিবাহ করতে পারবে। হযরত আদম (আ.) দুটি ছেলের নাম ছিলো হাবীল ও কাবীল। কাবীলের সাথে যে বোনের জন্ম হয়েছিলো সে ছিলো হাবীলের সাথে জন্ম নেয়া বোনের তুলনায় সুশ্্রী। হাবীলের সাথে জন্ম নেয়া বোনের সাথে কাবীলের এবং কাবীলের সাথে জন্ম নেয়া বোনের সাথে হাবীলের বিবাহ, আল্লাহর বিধান অনুসারে বিধিবদ্ধ ছিলো। কিন্তু কাবীল হিংসায় জ্বলে উঠলো। হাবীল সুশ্রী বনোকে বিবাহ করবে, এটা সহ্য হলো না। সে যে কোনো মূল্যে আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করে নিজের সহোদরাকে বিবাহ করতে চাইলো। আর হিংসার পথ ধরে মানব ইতিহাসে প্রথম হত্যাকন্ডের ঘটনা হিসেবে যুক্ত হলো, হাবীলের হাতে আপন ভাই কাবীলের মৃত্যু। আলোচ্য ঘটনা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মাইদার ২৭-৩০ আয়াতে স্ববিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে।
হিংসা মুমিনের নেক আমলকে সার শূণ্য করে দেয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলে, যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।”(সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৩) অপর একটি হাদীস হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অপরের বিরুদ্ধাচারণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয়।”(সহীহ আল-বোখারী ৬০৬৫, সহীহ মুসলিম: ২৫৫৯) হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“তোমাদের মধ্যে পূর্ববর্তী যামানার উম্মতদের রোগ সংক্রমিত হয়েছে। আর তা হলো পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা। এই রোগ মুন্ঠন করে দেয়। আমি এ কথা বলছি না যে, চুল মুন্ঠন করে দেয়, বরং এটা দ্বীনকে মুন্ঠন (বিনাশ) করে দেয়। সেই মহান সত্ত্বার নামে শপথ, যার হাতে আমার জীবন! তোমরা ঈমানদান না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে না পারলে ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে বলবো না, পারস্পরিক সভালোবাসা কোন কাজের মাধ্যমে দৃঢ় হয়? তোমরা পরস্পর সালামের বিস্তার ঘটাও।(জামে আত-তিরমিযী: ২৫১০) আলোচ্য হাদীস স্পষ্ট প্রমান বহন করে এ বিষয়ের উপর যে, যার অন্তরে হিংসা থাকে তার মধ্যে ঈমান থাকতে পারে না। আর ঈমানহীন ব্যক্তির শেষ পরিণতি জাহান্নাম’ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সুতরাং আমাদের সকলের উচিৎ হিংসা-বিদ্বেষ অন্তর থেকে বের করে দিয়ে পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমে ঈমানের পরিপূর্ণ অর্জন করে সামাজে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার মাধ্যমে পরকালীন মুক্তির পথকে সুগম করা। আল্লা রাব্বুল আলামীন সকল মুমিনের হৃদয়কে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত কনরুন! লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।
