ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপসের সুযোগ নেই
তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বায়ণ ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটালাইজেশনের মধ্য দিয়ে আমাদের সামগ্রিক জীবনধারা ক্রমেই ইন্টারনেট-অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়ছে। গতানুগতিক ম্যানুয়েল তথ্য পরিষেবার যুগ পেরিয়ে আমরা যতই ডিজিটালাইজেশনকে আত্মস্থ করছি, গতির সাথে সাথে আমরা ভিন্ন রকমের নিরাপত্তাহীনতার অনিশ্চিত এক জটিল আবর্তে নিপতিত হতে শুরু করেছি। এটি কমবেশি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা হলেও বাংলাদেশে এ খাতের নিরাপত্তাহীনতার সাথে দেশে বিদ্যমান দুর্নীতি ও ভূরাজনৈতিক দুষ্টচক্রের দ্বারা বন্দি হয়ে পড়েছে। বিশেষত বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ভারততোষণ ও ভারতনির্ভর কর্মকান্ড দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে গভীর এক খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফ্ট কোড হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে শত শত মিলিয়ন ডলার বেহাত হয়ে যাওয়া, এনআইডি সার্ভার থেকে কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার তৎপরতার সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান না ঘটলে এসব বিষয়ে জাতি হয়তো এখনো জানতেই পারতো না। চব্বিশের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের সার্ভার থেকে এনআইডি কার্ডধারী ১১ কোটি ভোটারের তথ্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে তৎকালীন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এ অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ডেটা সেন্টারের সাবেক পরিচালক তারেক এম বরকত উল্লাহকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর এর সাথে জড়িত সজিব ওয়াজেদ জয়, জুনায়েদ আহমেদ পলকসহ আরো ১৯ জনের নাম জানা যায়। হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন ও ভাগবাটোয়ারার বিনিময়ে ডিজিকন গ্লোবাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১১ কোটি ২১ লাখ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সার্ভারে প্রবেশের অনুমোদন দেয়া হয়। এ সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশি-বিদেশি ১৮২ টি কোম্পানির কাছে এসব তথ্য বিক্রি করে দেয়। অবস্থা যাই হোক, ডিজিটালাইজেশনের বাস্তবতা থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি-বেসরকারী তথ্যসেবা, স্বাস্থ্যপরিষেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়-বাণিজ্য, ব্যাংকিং সেবা থেকে ক্যাশলেস বিনিময় ব্যবস্থায় উত্তরণের বাস্তবতায় ডিজিটালাইজেশন ও সাইবার নিরাপত্তাকে বিশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান হারে অনলাইন ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠেছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ খাতের বিড়ম্বনা ও নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষত্ব ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের উপর অন্যদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশাধিকার ও হস্তক্ষেপের সুযোগ বড় ধরণের সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সরকার অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া সত্বেও প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবণতা ও প্রত্যাশা জেগে উঠেছে। বিশেষত গ্যাস, বিদ্যুত, জ্বালানির সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকারের সংম্লিষ্টরা শীঘ্রই সমস্যাকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। বিনিয়োগে দীর্ঘ স্থবিরতা এখনো কাটিয়ে উঠতে না পারলেও রেমিটেন্স প্রবাহ এবং গার্মেন্ট রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তার প্রধান নিয়ামক হতে পারে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে সাথে তথ্য প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে নতুন বাস্তবতার আলোকে বিবেচনায় এনে সব ধরণের নিরাপত্তাহীনতা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দেশের বিশাল জনশক্তিকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনসম্পদে পরিনত করে হাজার কোটি ডলার আয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূর করতে হবে। সেই সাথে ইন্টারনেটের কানেক্টিভিটি ও ব্যান্ডউইথের ক্ষেত্রে পরনির্ভরতা দূর করতে হবে। বিগত সরকারের আমলে কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা হয়েছিল তা দূর করতে সামগ্রিক ডেটা ও তথ্যব্যবস্থাপনাকে হালনাগাদ করতে হবে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা যেমন বাড়ছে, একইভাবে ডিজিটালাইজেশন, স্মার্টফোন ও তথ্যপ্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের কারণে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা ও গতিশীলতা অব্যাহত রাখাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ২ বছরের মধ্যে বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথ চাহিদা সেকেন্ডে ১৩.২ টেরাবাইট থেকে ২৭ টেরাবাইটে উপনীত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে পুরনো (ঝঊঅ-গঊ-ডঊ-৪) সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ (ঝঊঅ-গঊ-ডঊ-৬) এ সংযুক্ত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের ব্যান্ডউইথ সংকট মোকাবেলা করা। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সাথে সাথে আগামী কয়েক বছর ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সংকটের বিষয়টিকেও সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব না হলেও বিদ্যমান সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলোর উপর বাড়তি গুরত্ব আরোপ করতে হবে। ইন্টারনেট গেটওয়ে ও ব্যান্ডউইথ চাহিদা পুরণের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের উদ্যোগকে অবারিত করতে হবে।
