ছেঁড়া টাকায় কেন বাজার ভরা
বাজারে থাকা ছেঁড়া, ফাটা ও জীর্ণ ব্যাংক নোট যে মানুষকে ভোগান্তি দিচ্ছে, তার একটি উদাহরণ ওই ঘটনা। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা বলছেন, বাজারে এখন যত নোট আছে, তার একটি বড় অংশ অনেক পুরোনো। বাংলাদেশ ব্যাংক যথাসময়ে যথেষ্ট পরিমাণে পুরোনো নোট তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাড়তে পারেনি। এতে এসব ছেঁড়া নোট দিয়েই মানুষকে লেনদেন সারতে হচ্ছে। সমস্যা হলো অনেক সময় অনেক দোকানদার অল্প ছেঁড়া বা বেশি পুরোনো নোট নিতে চান না। মেট্রোরেলের টিকিট কাটার সময় যন্ত্র নোট রিজেক্ট (বাতিল) করে দেয়। ব্যাংকের সিআরএমেও একই সমস্যা হয়। উল্লেখ্য, এখন অনেক ব্যাংক ৫০ হাজার অথবা ১ লাখ টাকার কম জমাদানের ক্ষেত্রে সিআরএম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। মানুষের কাছে অনেক সময় বাড়তি টাকা থাকে না। ভরসা পকেটে থাকা পুরোনো নোট। তখনই বিপদে পড়তে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসহ নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ করে তারা; কিন্তু নতুন নকশা করে নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ কারণেই বাজারের বেশির ভাগ নোট এখন পুরোনো। অন্যদিকে নোট ছাপানোর খরচও বেড়েছে। দেশে ১০, ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার ব্যাংক নোট ছাপায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নোটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সই থাকে। অন্যদিকে ১, ২ ও ৫ টাকা সরকারি নোট (ধাতব মুদ্রাসহ)। এতে অর্থসচিবের সই থাকে। অবশ্য দুই ধরনের নোটই ছাপানোর কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ছাপানো টাকার পরিমাণ (রিজার্ভ মানি) ছিল ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। মানুষের হাতে ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার মতো। বাকিটা ছিল ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, অর্থাৎ আইনে টাকা ছাপানোর ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়া আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, টাকার নকশা অনুমোদন নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও।
অন্যদিকে কাঁচামাল সরবরাহের জন্য বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আগ্রহীদের নাম আহ্বান করা হয়। এরপর সেই আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নোট ছাপানোর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কাগজ (সিকিউরিটি পেপার), বিশেষ ধরনের কালি (ইনট্যালিও কালি), নিরাপত্তা সুতা (সেফটি থ্রেড) ও রাসায়নিক কেনার দরপত্র চাওয়া হয়। এসব উপকরণের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, ইতালি ও ইন্দোনেশিয়ার আটটি কোম্পানি কাঁচামাল সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, কাঁচামাল আসার পরও নোট ছাপাতে তিন মাসের মতো সময় লেগে যায়। কারণ, টাঁকশাল নামে পরিচিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের (এসপিসিবিএল) সক্ষমতা কম।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগপর্যন্ত ব্যাংক নোটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিল। দলটি ক্ষমতা হারানোর পর পুরোনো নকশার নোট ছাপানো বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকও জমা থাকা পুরোনো নকশার নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ রাখে। নতুন নোট ছাপানোর জন্য নকশা তৈরি, তা অনুমোদন এবং ছাপার কাজ শুরু করতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। এ সময়েই সংকট তৈরি হয়, যা এখনো কাটেনি। এখন অবশ্য বাজারে নতুন নোট ছাড়া হচ্ছে। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এখন ২ ও ৫ টাকার কাগুজে নোট ছাপানো বন্ধ। এ মূল্যমানের ধাতব মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্টে পড়ে আছে। গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে এসব মুদ্রা নিতে চান না। ব্যাংকগুলোও আগ্রহী নয়। সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২ ও ৫ টাকার কাগুজে নোট ছাপানো বন্ধ রেখে পয়সার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। সূত্র: প্রথম আলো
