পাহাড়ের বরফ যখন নেমে  আসে মৃত্যুর স্রোত হয়ে

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে বুধবার সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে বদলে গেল সবকিছু। পাহাড়ের ওপর থেকে বিশাল বরফ ও পাথরের অংশ ভেঙে নিচে নেমে এলো। সেই ধস আছড়ে পড়ল নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি, বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ মিলে তৈরি হলো ভয়ংকর স্রোত। পাহাড়ি নদী পেরিয়ে সেই স্রোত ছুটে গেল নেপাল-চীন সীমান্তের জনবসতির দিকে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এরপর বরফ ও পাথরের সেই স্রোত লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। নদী সাময়িকভাবে আটকে যায়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, পাথর ও বরফ একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যায়। এই ঘটনাটি আবার সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- হিমবাহ ধস আসলে কী? এটি কেন হয়? কীভাবে কয়েক টন বরফ একটি নদীকে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে? হিমবাহ ধস কী: সহজ করে বললে, পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা বিশাল বরফের স্তর বা হিমবাহের কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে এলে তাকে হিমবাহ ধস বলা যায়। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে ঘটনাটি এক ধরনের নয়। কোথাও বরফের বড় অংশ আলাদা হয়ে পড়ে। কোথাও বরফের সঙ্গে পাথর ও মাটি মিশে যায়। আবার কোথাও হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পানি বেরিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলোর গতি ও ধ্বংসক্ষমতা একেক রকম। বরফের বড় অংশ পাহাড় থেকে ভেঙে দ্রুত নিচে নামলে তাকে ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফধস বলা হয়। বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে সেটি ‘রক-আইস অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধসের রূপ নেয়। আবার হিমবাহ গলে তৈরি কোনো হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পানি হঠাৎ বেরিয়ে গেলে তাকে বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’, সংক্ষেপে জিএলওএফ।

একটি হিমবাহকে দূর থেকে স্থির মনে হলেও সেটি আসলে সব সময় পরিবর্তনশীল। বরফ ধীরে ধীরে সরে। কোথাও বরফ পাতলা হয়। কোথাও ফাটল তৈরি হয়। কোথাও বরফের নিচে পানি জমে থাকে। পাহাড়ের ঢাল, পাথরের গঠন, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত এবং বরফের ভেতরের পানির পরিমাণ- সবকিছু মিলে হিমবাহের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করে।

হিমবাহ ধসের প্রথম ধাপ হতে পারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি। তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহের ওপরের বরফ গলতে শুরু করে। গলিত পানি ফাটল দিয়ে নিচে ঢুকে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পানি হিমবাহের ভেতরে বা নিচে জমে চাপ তৈরি করে। দ্বিতীয় ধাপ হলো ফাটল তৈরি ও বড় হওয়া। হিমবাহের বরফে থাকা ফাটল সময়ের সঙ্গে প্রশস্ত হতে পারে। এসব ফাটলে পানি ঢুকলে বরফের ভেতরের চাপ আরো বাড়ে। কোনো পর্যায়ে বরফের একটি অংশ তার নিজের ওজন ধরে রাখতে না পেরে আলাদা হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় ধাপ হলো ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। হিমবাহের নিচে বরফ, পাথর, মাটি ও পানি থাকে।

পানি সেখানে জমে গেলে বরফ ও পাহাড়ের পাথরের মধ্যকার ঘর্ষণ কমে যেতে পারে। ফলে বিশাল বরফের অংশ হঠাৎ পিছলে যেতে পারে। চতুর্থ ধাপ হলো ধসের সময় গতি বেড়ে যাওয়া। একবার বরফের বড় অংশ ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলে তার সঙ্গে পাথর, মাটি, বরফের ছোট টুকরা ও পানি যুক্ত হয়। নিচে নামার সময় এই উপাদানগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে বিশাল ধ্বংসস্তূপ তৈরি করে। ফলে শুরুতে বরফের একটি অংশের ধস শেষ পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ভয়ংকর ধ্বংসপ্রবাহে পরিণত হতে পারে।

হিমবাহ ধসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো পানি। বরফ গললে পানি তৈরি হয়। এই পানি হিমবাহের ফাটল দিয়ে নিচে ঢুকে জমতে পারে। আবার ধসের সময় বরফের সঙ্গে থাকা পানি বেরিয়ে আসতে পারে। বরফ ও পাথর নদীতে গিয়ে পড়লে নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় কাদা ও পাথর। ফলে নিচে নেমে আসা স্রোত আর সাধারণ পানির স্রোত থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে কাদা, পাথর, বরফ ও পানির ঘন মিশ্রণ। এ ধরনের স্রোত অনেক ভারী এবং ধ্বংসক্ষম। পথের ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনকি বড় বড় অবকাঠামোও এর সামনে টিকতে পারে না। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও এমনটাই হয়েছে। বরফ-পাথরের ধস নদীকে সাময়িকভাবে আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নিচে নেমে আসে। নেপালের কয়েকটি এলাকায় নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক মিটার বেড়ে যায়। সূত্র: কালের কন্ঠ

ভালো লাগলে, প্লিজ শেয়ার করুন

এ ধরনের আরো কিছু পোস্ট